বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় ঘোষণার পরে আইনমন্ত্রী বলেছেন, তারেকের মৃত্যুদণ্ড হওয়া উচিত ছিল। একচেটিয়া দলীয়করণ ও বিচার বিভাগের উপর সর্বময় বলপ্রয়োগের এই সময়ে যেকোন পর্যায়ের বিরোধী দল সংশ্লিষ্ট হত্যা মামলার রায়ের মূল বক্তব্য হচ্ছে ‘ফাঁসি’। যেহেতু তারেক রহমনাকে চূড়ান্ত সাজা অর্থাৎ ‘ফাঁসি; দেয়া যায়নি, তাই গ্রেনেড হামলায় তারেকের সংশ্লিষ্টতা কিংবা সংশ্লিষ্টতার গভীরতা নিয়ে সন্দেহ তৈরির অবকাশ তৈরি হয়ে গেছে বলে মনে করছেন সরকারি মহল।
সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া হত্যা মামলা এবং ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা, এই দু’টি মামলাই বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষ সেন্সিটিভ মামলা। এতে কারা জড়িত তা নিয়ে বাংলাদেশের গোয়েন্দাদের এখনও কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। কেননা সেখানে বাইরের প্রভাব ছিল বলেই প্রবল মত ছিল। তাই তদন্ত স্বাধীনভাবে এগুনোর পথকে রুদ্ধ করে দেয়া হয়েছে। এ এম এস কিবরিয়া হত্যা মামলার চার্জশিট বার বার তার পরিবার প্রত্যাখ্যান করে এসেছে। অন্যদিকে ২১ অাগস্টের মামলার বিচার ক্রমাগত ভাবে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে এগিয়ে গেছে।
ব্যাপারটা এখানেই শেষ হয়নি, এই ২১ অাগস্ট গ্রেনেড হামলার উপর ভিত্তি করে বাংলাদেশে একটি শাসনতন্ত্রও দাঁড় করানো হয়েছে, এটা বলে যে, “বর্তমান সরকার ক্ষমতা ছাড়লে সরকার দলের অনেককেই হত্যা করা হবে। যেহেতু শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের বিশ্বস্ততা অবশিষ্ট নেই তাই সরকার প্রধানকে ক্ষমতায় রেখেই নির্বাচন হতে হবে। কিংবা সরকার প্রধান নির্বাচনহীনভাবে ক্ষমতায় থেকে যাবেন আমৃত্যু। শুধু তাই নয় এটাও বলা হচ্ছে এই সরকার ক্ষমতা হারালে দিনে লাখ লোক মারা হবে।” নির্বাচনহীন অবৈধ ক্ষমতায়ণ দীর্ঘায়িত করার এই অপ্রতিরোধ্য প্রচেষ্টায় ২১ অাগস্ট গ্রেনেড হামলার সুফল কোনভাবে সংশ্লিষ্ট কিনা সেটাও ভেবে দেখা দরকার।
যেখানে নির্বাহী প্রভাবের বাইরে বিচার বিভাগের কোনই অস্তিত্ব নেই সেখানে দ্বন্দ ও সন্দেহ মুক্ত হয়ে নিশ্চিন্তে থাকাটাও অপরাধ বটে! বিচার বিভাগের একটা স্বাধীন ও চূড়ান্ত সত্তা ছাড়া মুক্তির যে কোন পথ রহিত।
অন্যদিকে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মামলা ও রায়ের বিপরীতে বিএনপি’র পক্ষ থেকে জোরালো কোন ডকুমেন্টেশন তৈরি হয়েছে কি? কোন গ্রহণযোগ্য বক্তব্য জনগণ পাচ্ছে কি? যে বিষয়গুলোর উত্তর জরুরি তা হল:
ক. সমাবেশের অনুমতি চাওয়া বা না চাওয়া, অনুমতি দানের প্রক্রিয়া, নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
খ. স্থান পরিবর্তন
গ. তাৎক্ষণিক স্থান পরিবর্তনের কারণ অনুধাবনে সত্ত্বেও গোয়েন্দা ও রাজনৈতিক ব্যর্থতা
ঘ. হামলা পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবেলায় আওয়ামীলীগের ভূমিকা
ঙ. হামলা পরবর্তী গোলাগুলি ও সাবের হোসেনের ভূমিকা
চ. খালেদা জিয়া কেন সুধা সদনে যাননি?
ছ. সরকারি বিবৃতির নথি পুনঃপ্রচার, কোন বিবৃতি ছিল কিনা?
জ. তৎকালীন সরকার আহতদের চিকিৎসায় কি কি ভূমিকা নিয়েছে
ঝ. জজ মিয়া নাটকের প্রেক্ষাপট ও গোয়ান্দা সুত্র
ঞ. গোয়েন্দা অনুসন্ধানের ফাঁক, রায়ের বক্তব্য ও তার রাজনৈতিক সুত্র সংযোগ, রায়ের পুর্নাঙ্গ কপি, রায়ের প্রেজেন্টেশন ও কন্টিনিউটি। বিচারকের ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাই।
এছাড়া বিশেষ ভাব দেখতে হবে, মুফতি হান্নানের জবানবন্দির বিষয়টি। অন্য একটি মামলায় তার ফাঁসি হলেও তিনি যেহেতু এই মামলার গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি কেন তার মৃত্যুদণ্ড দেয়ার পরে এই মামলার রায় দেয়া হল। রায় দেয়ার আগেই তিনি দুনিয়া থেকে চলে যাওয়ায় উনার কথার উপর ভিত্তি করে যাদের আসামী করা হল তাদের শাস্তির ব্যাপারে জনগনের মনোভাব কি হবে তাও ভেবে দেখা দরকার।
অন্যদিকে নির্বাচনের আগে এই মামলাকে রাজনৈতিক ভাবেই দেখা হচ্ছে। ধারণা করা হয়েছিল, রায়ের পরে বিএনপি রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ জানালে পুলিশ ব্যাপক অ্যাকশনে যাবে। ইতোমধ্যে মামলা ও জেলে বিএনপির নেতারা বেহাল অবস্থায় আছে। এই রায়ের পরে যতটুকু মাঠে নামার শক্তি আছে তাও শেষ করে দিতে পারলে নির্বাচনের মাঠে ক্ষমতার দাপট অক্ষুন্ন রাখা সম্ভব হবে। কিন্তু বিএনপির নিরুত্তাপ ভূমিকা এই পরিকল্পনার বাস্তবায়নে বড় বাঁধা হয়ে দেখা দিল।
সবশেষে বলতে হবে, একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলাকে ঘিরেও যখন রাজনীতি ও রাজনৈতিক হিংসার বিষয়টিই চর্চা হয় তখন আইনের শাসনের কথা কেবল কেতাবি কথাই থেকে যায়। জনগণ এই অবস্থা থেকে মুক্তি চায়।