সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো আমাদের ধীরে ধীরে চিন্তামুর্খ রাজনৈতিক চরমপন্থীতে পরিণত করছে

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো আমাদের ধীরে ধীরে চিন্তামুর্খ রাজনৈতিক চরমপন্থীতে পরিণত করছে

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকেই এখন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় এবং ছড়িয়ে থাকা যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ধরা হয়। খুব সহজে এবং অল্প খরচেই যোগাযোগ সম্ভব হয় বিধায় এটার জনপ্রিয়তা দিনে দিনে বেড়ে এখন তুঙ্গে। তবে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোর ব্যবহারেও এসেছে ভিন্নতা। শুধু কথা বলায় না, নিজের মত এবং মতের সাথে মিল রেখে নানা ওয়েব লিংক শেয়ার করা, ভিডিও, ছবিসহ নানা কিছু এই মাধ্যমগুলোর সাথে ছড়িয়ে দেয়া যায় মুহুর্তেই। শুরুতে এই সকল মাধ্যমগুলোর উপযোগিতা এবং আনন্দ উপভোগ্য হলেও এখন নানা রকম আদর্শ ও চেতনা প্রকাশের মাধ্যমে মগজধোলাইয়ের কারখানায় পরিণত হয়েছে। এই সকল মাধ্যমগুলি। তাছাড়া ভুল ও মিথ্যা সংবেদনশীল সংবাদ ছড়িয়ে দেয়া বা ভাইরাল করার মাধ্যমে হচ্ছে নানা রকম অযাচিত ঘটনা।

সামাজিক যোগাযোগের মিথ্যা প্রোপাগান্ডা ছড়ানো বা রাজনৈতিক বা সামাজিক উদ্দেশ্যে কারোর ব্যাক্তিগত জীবন বা কোন গোষ্ঠিকে ছোট করা এবং ট্রল বা মিমস বা ব্যঙ্গ করণের মাধ্যমে যেকোন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে মজা করা এখন খুব সাধারণ একটি ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি উপকার হচ্ছে রাজনৈতিক চরমপন্থা ছড়িয়ে দেয়া। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো দিয়ে আমাদের দেশেই কত হট্টোগোল হয়েছে তা বলাটাই অনেক। কোন এক ধর্মগুরুর চেহারা চাঁদে ভাসছে বা কোন দেশে নিজ ধর্মের উপর আঘাত হানা হচ্ছে এসব খবর ছড়ানোর মাধ্যমে আমাদের দেশেও অনেক সময় ছড়িয়ে পড়েছিল দাঙ্গা, হট্টগোল! সামাজিক যোগাযোগগুলোর মাধ্যমে মূলত তিন ভাবে চিন্তাশক্তিহীন রাজনৈতিক চরম দর্শনগুলো ছড়িয়ে পড়ছে— ১. ইকো চেম্বার, ২. কৌশল ও দৃঢ়তা, ৩. ব্যাঙ্গ বা মিমস এর মাধ্যমে।

১. ইকো চেম্বার  :  ইকো চেম্বার কথাটা মূলত গণমাধ্যমে ব্যবহৃত হয়। এটা দিয়ে বোঝা হয় যখন কোন গুরুত্বপূর্ণ খবর কোন মাধ্যমে প্রকাশিত হয় এবং তড়িৎ গতিতে তা অন্যান্য গণমাধ্যমগুলোতে ছড়িয়ে পরে। তবে সামাজিক গণমাধ্যমগুলোর মাধ্যমে তা হয় অনেক অস্বাভাবিকভাবে। যে কোন স্পর্শকাতর খবর বা তথ্য খুবই দ্রুত পৌছে যায় লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে। খবরটি কি সত্য না মিথ্যা তা যাচাই করার আগেই মানুষ সেই খবর বা তথ্যের উপর নিজেদের মতামত জাহির করেন এবং নানাবিধ প্রতিক্রিয়াও দেখা যায়। গত বছর নিরাপদ সড়ক আন্দোলন চলাকালীন সময়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অফিসে ছাত্রী ধর্ষণের খবর ছড়িয়ে পরে। মুহূর্তেই এই খবর ছড়িয়ে গেলে তীব্র ক্ষোভের সাথে প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে পড়তে থাকে। এই ঘটনা ভূঁয়া প্রমাণ করতে এবং শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে বন্ধ করতে ছাত্রলীগ অসহায় ছাত্রদের উপর হামলা চালায়। সাংবাদিক, ছাত্রসহ শত শত আহত হয় সংঘর্ষে। এতে করে অনেক সত্য খবরকেও মিথ্যে বলে বিভ্রান্ত করা সহজ হচ্ছে। তাছাড়া আজকাল কার যুগে ফ্যাসিজমের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার মিথ্যে প্রশংসা এবং ফ্যাসিস্টের পক্ষে সকল বানোয়াট খবর।

২. কৌশল ও দৃঢ়তা : নানা কৌশলেই আজকাল নানা আদর্শকে ছড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে। নিজস্ব মতবাদ প্রচার করছে তবে তার সাথে খুবই দৃঢ়ভাবে শুধুই প্রত্যাখ্যান না, নানাভাবে হেনস্তা করা হচ্ছে অন্যান্য মতবাদকে। তাছাড়া সন্ত্রাসবাদ ছড়ানোর এক বিশাল মাধ্যম হয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো। মানুষ নিজেকে সহি প্রমাণ করতে হচ্ছে মরিয়া এবং দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ছে। এভাবেই হচ্ছে নানা শত্রুতা এবং কমছে রাজনৈতিক ও মতবাদভিত্তিক সহনশীলতা।

৩. ব্যঙ্গ বা মিমস : আজকাল মিমস খুবই জনপ্রিয়। বিভিন্ন পেজ এবং সাইটের মাধ্যমে বিভিন্ন ছবি ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে যা মূলত মানুষকে হাসাচ্ছে। মূলত বিনোদনের জন্যই বানানো হয় এসকল মিমস। তবে সাহিত্য, রাজনৈতিক এবং গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ইস্যুগুলোকেও নিয়ে তৈরি হচ্ছে নানা রকম ব্যঙ্গ যা চিন্তাশীলতাকে ছোট করছে। সব কিছু হাসিচ্ছলে গ্রহণ করার মাধ্যমে সবকিছুই হারাচ্ছে গুরুত্ব। এতে সাংস্কৃতিক ও সামাজিকভাবে চিন্তাশক্তিহীন হয়ে পড়ছে দেশের তরুণ সমাজ। অনেক সময় নিজের মতবাদের বাহিরে গিয়ে অন্যের মতবাদ বা বিশ্বাসকেও করা হচ্ছে আঘাত। এর ফলে এক অসহনশীল প্রজন্ম তৈরি হচ্ছে যা ভয়ানক।