বিজ্ঞাপনের খেলায় খেলা বেহাল

বিজ্ঞাপনের খেলায় খেলা বেহাল

বহুদিন ধরেই বাংলাদেশের বিনোদন জগতের তারকাদের মুখে বিজ্ঞাপন নিয়ে একটি কথা শোনা যায়। প্রায়শ তারা আক্ষেপের সুরে বলেন যে, আগে নাটকের মাঝে বিজ্ঞাপন দেখানো হতো, এখন বিজ্ঞাপনের মাঝে নাটক। খেলার পাতায় বিনোদনের জিকর করায় আমার বোধ নিয়ে সন্দিহান হবার আগে একটু সবুর করুণ।

সামনে বিপিএল আসছে বলে প্রসঙ্গটির অবতারণার জারুরাত বোধ করছি। কেননা, বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষই খেলা দেখে থাকেন টিভির পর্দায়। আর এ সুযোগটিকে কাজে লাগিয়ে সম্প্রচারকারী চ্যানেল করে রমরমা ব্যবসা। তা তারা করুক। কারো দর্শন যদি কারো উদরের ক্ষুধা মেটায় তাতে আপত্তির কী আছে? সমস্যাটা হচ্ছে উদরের ক্ষুধা এতটাই যে খেলা দেখাটাও এখন নাটক দেখার মতন হয়ে গিয়েছে। ওভারের শেষ বলে কিপারের গ্লাভসে বল জমা পড়তে দেরি, সাথে সাথে বিজ্ঞাপন! সেটি আবার শেষ হয় পরের ওভারের পয়লা বলের মাঝামাঝি গিয়ে!

এটুকুতেই শেষ হলে কথা ছিল না। আচমকাই দেখবেন, আপনার ৩২ ইঞ্চির সাধের টেলিভিশনের স্ক্রিন ২৪ ইঞ্চি হয়ে গিয়েছে। খেলার আগে পরে তো বটেই মাঝেই আচমকা এল শেপে বিভিন্ন পণ্যের স্থির বিজ্ঞাপন প্রদর্শন হয়! তাতেও থামলে চুপ থাকা যেত। একটি বল শেষে পরের বলটি করার জন্য বোলার দৌড় শুরু করার জন্য নিজ প্রান্তে যাচ্ছেন, এমন অবস্থায় আচমকাই দেখবেন মাঠ ফুড়ে বাড়ি বের হয়ে এসেছে! সেখানে টিনের গুণকীর্তন! হালতটা ভাবুন একবার। এমন ভাবে খেলা দেখাও এক ধরনের মানসিক অত্যাচার। অথচ, এই বিষয়টি নিয়ে কেউ কখনো রা করে না।

খেলা তো পণ্য হয়েছে ঢের আগেই। সেইটা কতটা তা বোঝা যায় এই ফ্রাঞ্চাইজি ভিত্তিক আসরগুলোতে। বিজ্ঞাপন দেখানোর জন্য এ ধরনের আসরগুলোতে বিশেষ এক ব্যবস্থা রয়েছে। যেইটার কেতাবী নামটা আর খুবসুরাত। স্ট্র্যাট্যাজিক টাইম আউট! দুই ইনিংসের দু’দফায় মোট চারবার চলে এ রঙ্গ, তাও আড়াই মিনিট করে! এর পক্ষে স্বীকৃত যে বয়ান তাতে বলা হয়, এটি খেলোয়াড়দের সুবিধার জন্য। তা, খেলোয়াড়দের সুবিধার জন্যই যদি হয়, তাহলে সেটি তারা ব্যবহার করবে কি করবে না, সে স্বাধীনতা খেলোয়াড়দেই থাকা উচিত। আমার সাধারণ বোধে এটাই বলে। সেটি না করে খেলোয়াড়দের বাধ্য করা তো খেলোয়াড়দের সুবিধার জন্য হতে পারে না।

এটি বলছি, কারণ ক্রিকেট খেলায় রিদম একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একজন ব্যাটসম্যান যখন রিদমে থাকে তখন তাকে টাইম আউট নিতে বাধ্য করার ফলে বহুবার ব্যাটসম্যান নিজেই আউট হয়ে ফিরেছেন! এখানে তাইলে, খেলোয়াড়ের লাভটা ঠিক কোথায়? রিভিউ’র ক্ষেত্রে যেমন একজন খেলোয়াড় পূর্ণ স্বাধীনতা পায় ব্যবহার করা না করা নিয়ে। টাইম আউটে সে সুযোগটাই নেই!

দুঃখের বিষয় হচ্ছে টিভি সত্ত্ব বিক্রি করে বিসিবি বেশ ভালো অংকের একটা আয় করে। সেটি তারা করুক। বিষয়টি অবৈধ কিছুও না। আমাদেরই তো বোর্ড। কিন্তু যাদের দ্বারা এ আয়টা হয় তাদের একদম উপেক্ষা করাটা যেন কেমন ঠেকে। বিষয়টি যদিও বিসিবির হাতে নেই। কিন্তু সম্প্রচার সত্ত্ব যেহেতু নিজেদের দেশি একটি টিভি চ্যানেলের কাছে বিক্রি করা, তাদের কাছে দর্শকদের হয়ে এটুকু আবদার বিসিবি করতে পারে বলেই আমাদের বিশ্বাস।

বাংলাদেশে খেলা হয় হাতে গোণা কয়েকটা মাঠে। আবার সে সব মাঠের দর্শক ধারণ ক্ষমতাও জনসংখ্যার তুলনায় কম। এমন অবস্থায় সাধারন দর্শকদের খেলা দেখার জন্য ভরসা ঐ চৌকনা বাক্সই। এবং এরা সংখ্যায়ও বেশি। বিসিবি যে চওড়া মূল্যে প্রচার সত্ত্ব বিক্রি করতে পারে সেটি এই বিশাল সংখ্যক দর্শকদের জন্যই। সাধারণ দর্শকরা তো আয়ের অংশও দাবি করে না, কখনো টাকা অংকটা জানতেও চায় না। তারা চায় একটু শান্তিতে খেলা দেখতে।

আপনারা যারা টিভিতে নিয়মিত খেলা দেখে থাকেন হালত তো আপনাদের জানাই। কর্তারা যেহেতু মাঠে বসে খেলা দেখেন, তাই এ চিত্রটা তাদের অজানা থাকতে পারে। মিডিয়াও কখনো এ নিয়ে কোনো শব্দ করে না। একজন সাধারণ দর্শক কোনো ব্যাটসম্যানের রান মুখস্ত করে বসে থাকে না। আউট হবার পরে স্কোর দেখানোর রেওয়াজটা সে জন্যই। আমাদের এখানে তার ধার ধারে কে? আউট হতে দেরি বিজ্ঞাপন শুরু! মাঠে তাও দৃশ্যটি মিস হলে জায়ান্ট স্ক্রিনে আরেকবার দেখার সুযোগ থাকে। এসব আসরে টিভির দর্শকরা সে সুযোগটুকুও পায় না। রিপ্লে দেখাবে কি, পরের বলের অর্ধেকের সময় যে শেষ হয় বিজ্ঞাপন!

আবার একজন নতুন ব্যাটসম্যান আসলে তার রান, গড়, স্ট্রাইক রেট; মোট কথা ক্যারিয়ারের স্টাটিসটিক দেখে দর্শকরা একটা ধারণা করে নেন। সে সুযোগও যে এসব আসরে তারা পাননা তা এতক্ষণে বুঝে যাবার কথা। এলবিডব্লু’র ক্ষেত্রে অনেক সময় সন্দেহ থাকে মনে, সেটি দর্শকরা নিশ্চিত হয় রিপ্লে দেখে; এখানে রিপ্লে দেখবে কি? বিজ্ঞাপনের মাঝে বল দেখাটাই তো ভাগ্য হয়ে গিয়েছে প্রায়!

টিভির দর্শকরাই যে শুধু বিপদে আছেন তা না, একই হালত রেডিওর শ্রোতারাও। স্কোর শুরু হয় বিজলী ক্যাবল দিয়ে! একবার বিজলী ক্যাবল অমুক দল এত করেছে বিনা উইকেটে শুনে কিছুক্ষণ বোকা হয়ে বসে ছিলাম। এই নামের কোনো দলের কথা আগে শুনিনি কি না। চার মারলেও সাথে সাথে হৈ হৈ করে গান শুরু, আউট হলেও তাই। এর মাঝে ধারা বর্ণনাকারী যে মাথা ঠিক রাখতে পারেন এই তো অনেক। খেলার মাঝে যতবার তাদের বিজলী ক্যাবল, প্রাণ ফ্রুটো ইত্যাদির নাম নিতে হয়, এতবার তারা নিজের নাম নিয়েছে কি না সন্দেহ লাগে আমার!

খেলা শেষ হলে ইদানিং আমরা হাইলাইটস দেখার জন্য নির্ভর করি নেটের ওপর, আরো স্পষ্ট করলে ইউটিউবের ওপর। সেখানেও শান্তি নাই। অফিসিয়ালি যারা নেটে খেলা দেখানোর সত্ত্ব পেয়েছেন তারাই বা কম যাবে কেন? ২৫ মিনিট’র হাইলাইটসে প্রতি তিন চার মিনিট পরপরই বিজ্ঞাপন! হালতটা এমন যে, যদি সুযোগ থাকত, আপনি কিছু না দেখে চোখ বন্ধ করে থাকলেও কেউ এসে কানের সামনে পণ্যের প্রচার করেই ক্ষ্যান্ত দিতেন। প্রচারেই প্রসার বলে একটা কথার প্রচলন রয়েছে। কিন্তু লাগামছাড়া প্রচারের হালত নিয়ে বোধ করি আজ অব্দি গবেষণা হয়নি।

দেখুন, বাংলাদেশের যে এত বড় একটি বাজার ক্রিকেটের তা কিন্তু এই দর্শকদের জন্যই। দর্শকরা খেলা না দেখলে হাজার ভালো খেলেও অর্থ প্রাপ্তিটা এখনকার মত হতো না। এবারের বিপিএল নিয়ে বিসিবি নাকি বেশ গুরুত্ব দিয়ে ভাবছে। তাই, কর্তাদের কাছে আর্জি থাকবে এ বিষয়টির দিকে একটু নজর দেয়ার। কথাটা এ জন্য বলছি যে, যারা প্রচার সত্ত্বের মালিক তারা আমাদের দেশেরই। তারা না হয় দর্শকদের পণ্যভাবে, আমাদের কর্তারা এমনভাবে বলে ভাবতে ইচ্ছা করে না। যদিও টাইম আউটকে বৈধতা দিয়েছেন তারাই। সে তর্ক আপাতত না করি। বোর্ডের পক্ষে তো শক্ত যুক্তিও আছে, টাইম আউটের নামে বৈধভাবেই দশ মিনিট টানা বিজ্ঞাপন দেখানোর ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। বাকি সময়টা যদি দর্শকরা একটু রেহাই পেত আখেরে প্রশংসাটা বিসিবিরই হতো।