হোপের হাতে হারল নির্বাচক একাদশ

হোপের হাতে হারল নির্বাচক একাদশ

প্রথম ওয়ান ডে’র পরেও যে দলটি বাংলাদেশের বিপক্ষে ন্যূনতম প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারবে বলে ভাবা যায়নি, সেই উইন্ডিজই দাপুটে জয়ে সিরিজে সমতা এনে চোখ রাঙাচ্ছে বাংলাদেশকে। ম্যাচটি বাংলাদেশ দল বাংলাদেশ নামে খেলেছে বটে, কিন্তু এটি আদতে ছিল নির্বাচক একাদশ।

ব্যাটিংএ ৩০-৪০ রান কম হয়েছে, ক্যাচ মিস হয়েছে একাধিক, সাকিব-তামিম-মুশফিকরা বড় ইনিংসের সম্ভাবনা জাগিয়েও ফিনিশিং টাচ দিতে পারেননি, সত্য; কিন্তু সব কিছুর আগে আসে দল নির্বাচন নিয়ে ক্রমাগত স্বেচ্ছাচারিতা।

শুরু থেকেই শুরু করা যাক। গত লেখাতেই বলেছিলাম তামিমের সাথে বাকি তিন ওপেনার নিয়ে যে মধুর সমস্যার কথা বলে আত্মশ্লাঘায় সাধারণ সমর্থকদের ধোঁকা দিতে চেয়েছিলেন নির্বাচকরা সেটা ছিল পুরোটাই মিডিয়া হাইপ। এ ম্যাচে খেয়াল করেন; তামিম, মুশফিক, রিয়াদ এবং সাকিব; রান করেছেন চারজন। বাকি যে তিনজন, তাদের কাছে যা প্রত্যাশা ছিল তার সামান্যতম পূরণও করতে পারেননি কেউ। সাতজন ব্যাটসম্যানের তিনজনই যখন কোটায় খেলেন তখন ঠিক কি প্রত্যাশা করা উচিত সেটাই তো স্পষ্ট না।

ইমরুল যে চেহারায় পেস বল সামলালেন, তাতে মনে হচ্ছিল তিনি যেন সাক্ষাৎ যমদূতের সামনে দাড়িয়ে আছেন। সৌম্যের আচমকা উইন্ডিজের ক্যাচিংয়ের হালত কেমন সেটা পরীক্ষায় কেন ব্রত হলেন তিনিই জানেন। ফিল্ডার থাকার পরেও তাকে তুচ্ছজ্ঞান করে যেভাবে ক্যাচটি উপহার দিলেন তারপরেও যদি তার পক্ষে সাফাই শোনা লাগে; তাহলে বলতেই হয়, বাকি যারা ঘরোয়া লিগে ভালো করে জাতীয় দলে খেলার আশায় রয়েছেন, তারা ভিন্ন পেশা দেখতে পারেন। লিটন হাসপাতাল ঘুরে এসে অধারাবাহিকতার ধারাবাহিকতা বজায় রেখে ফিরেছেন যত দ্রুত সম্ভব।

গত লেখায় ব্যাটিং অর্ডারের বিষয়ে কথা বলেছিলাম। উইন্ডিজ সিরিজে তিনে সাকিব নিয়মিত ভালো করার পরেও যার দলেই থাকার কথা না সে ইমরুলকে সাকিবের জায়গায় নামানো ব্যাখ্যার দাবি রাখে। ম্যানেজমেন্টের একজন মিথুন এর দুর্ভাগ্য নিয়ে সেই লম্বা চওড়া একটা বয়ান দিয়েছিলেন। বান্দা আসলেই দুর্ভাগা। নিজেকে কেবলই যখন প্রমাণ করতে শুরু করছেন তখন মধুর সমস্যা সমাধানে বাদ! বহুদিন ধরে বলে আসছি, স্লগ হিটিং’এ আমাদের সমস্যা রয়েছে; কালকে সেটি আরো স্পষ্ট হলো। একজন স্লগারের অভাবে শেষের দিকে বলতে গেলে রানই হয়নি। আরিফুল ঘরোয়া লিগে পরীক্ষিত হিটার। তাকে কয়েক ম্যাচ খেলিয়ে বাদ দেয়ারও কোনো যুক্তি নেই। যে ম্যাচগুলো বান্দা খেলেছেন তাতে কিছু করে দেখানোর সুযোগ বলতে গেলে পাননি। তবু, বাদ!

আপনি যখন জিতবেন তখন অনেক সমস্যাই চোখে পড়বে না, পড়লেও এড়িয়ে যেতে চাইবেন। সেটাই হয়েছে। প্রথম ম্যাচ শেষেই তো স্পষ্ট ছিল চার ওপেনার খেলানোর কোনো যুক্তি নেই। নির্বাচকরা হয় এটা প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে তারা যা বোঝে তার আধ্ধেক ক্রিকেটও কেউ বোঝে না, অথবা দলে শুধু তারাই খেলবে যারা নির্বাচরদের যেকোনো উপায়ে তুষ্ট করতে সক্ষম। কথাটা তেতো শোনালেও বলতে বাধ্য হচ্ছি। কেননা, কোনো ক্রিকেটিয় যুক্তিতেই চার ওপেনার খেলানোর তত্ত্ব খাটে না, বিশেষ করে যখন তামিম-লিটন বাদে বাকি দুই জনের অবস্থা ভয়াবহ। আর লিটনও মন্দের ভালো। শুধু তামিম-সাকিব-মুশফিকে ভর করেই প্রত্যেক ম্যাচ পার পাওয়া যাবে এই চিন্তাটাই তো অদ্ভুত।

বোলিং নিয়ে সমালোচনা করাটা কিছুটা কঠিনই ঠেকছে। ম্যাচের শুরুতে আতহার আলী খান স্পষ্ট করেই বলেছিলেন তিনশ’র কমে স্কোর এ পিচে প্রতিপক্ষকে আটকানো কঠিন। সেখানে আমাদের ত্রয়ীর সাফল্যে! তিনশ’র কাছাকাছিও যায়নি স্কোর। তারপরেও বোলাররা বেশ ভালোমতনই দলকে খেলায় রেখেছিলেন। কিন্তু সেখানে বাগড়া দিলেন ফিল্ডাররা। আরো স্পষ্ট করে বললে ইমরুল এবং অপু। নতুবা, যখনই কোনো জুটি চোখ রাঙাচ্ছিল বোলাররা কিন্তু ব্রেক থ্রু এনে দিয়েছেন।

ব্যাট হাতে অনবদ্য নৈপুণ্যের পর ইমরুল উইন্ডিজের প্রিয়পাত্রে পরিণত হয়েছেন হাতের ক্যাচ ছেড়ে। যদিও হাতের বদলে কোনো এক অজ্ঞাত কারণে বুক দিয়েই ক্যাচটি নিতে চেয়েছিলেন তিনি। তাতে তার বুকের হালত কি হয়েছে তা তো জানা নেই, যারা জয়ের আশায় বসে ছিলেন তাদের বুকে যে ক্ষরণ হয়েছে এটা স্পষ্ট। কারণ, তার অনবদ্য প্রচেষ্টা ব্যর্থ হবার সাথে বাড়তি হিসাবে মাঠও ছেড়েছেন তিনি। আর তার জায়গায় নেমে অপু পূরণ করেছেন সর্বনাশের ষোলকলা। যেমন, শেষ ওভারটির কথাই ধরুন; ছয় বলে যখন ছয় রান লাগে তখন যে রকম ফিল্ডিং হবার কথা হয়েছে তার ঠিক উল্টো। প্রথম বলে যে দুই রান হলো, সেটি উইন্ডিজের কাজটাকে সহজ করে দিয়েছে পুরোই। আর যে ক্যাচটি তিনি ছেড়েছেন ম্যাচের ঐরকম সময় ক্যাচ হাতছাড়া হলে বোলারের ওপর দায় চাপানোর সুযোগটা থাকে কই?

অনেকে বোলিং পরিবর্তন বা ফিল্ড প্লেসিং নিয়ে কথা বলেছেন। আমি অন্তত এইসব জায়গায় খুব একটা সমস্যা দেখিনি। ম্যাচটি আমরা অর্ধেক হেরে বসেছি ব্যাটিংয়ের সময়ই, এরপরেও বোলাররা যা করেছে তা কোনো অংশেই খারাপ বলব না। শেষ ওভারে যখন মাত্র ছয় রান লাগে, তখন জুয়া খেলাটাই স্বাভাবিক। ভাগ্য সহায় হলে এ জুয়াই ম্যাচ জিতিয়ে আনত।

আমি একেবারেই স্পষ্টভাষায় বলি; ম্যাচটা বাংলাদেশ হেরেছে নির্বাচকদের নির্বিচার পক্ষপাতের কারণে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে এখন সিরিজ হারটাও অস্বাভাবিক লাগবে না। কারণ, একটা মোমেন্টাম অনেক সময় অনেক কিছুই বদলে দেয়, উইন্ডিজ সেটা পেয়ে গিয়েছে। একটু অপ্রাসঙ্গিক হলেও একটি প্রসঙ্গের জিকর করব।

মাশরাফি-সাকিবদের পঞ্চপাণ্ডবের সাথে মোস্তাফিজ এবং মিরাজসহ সাতজন বিশ্বমানের খেলোয়াড় রয়েছে আমাদের। চারজন যদি তাদের যথাযথ সমর্থন দিতে পারে তাহলে আসন্ন বিশ্বকাপে আমাদের বেশ ভালো সুযোগ রয়েছে ইতিহাস সৃষ্টি করার। এমন চারজন খেলোয়াড়ও রয়েছে আমাদের। কিন্তু শুধু মাত্তর নির্বাচকদের খেয়ালের খেসারত দিয়ে সে সুযোগই শুধু না হারতে হতে পারে চলতি সিরিজটিও। বাংলাদেশ যখন বাংলাদেশ হয়ে খেলে তখন একটি অজেয় রুপ দেখা যায়, কিন্তু সেটি যখন হয়ে যায় নির্বাচক একাদশ তখন ললাটে জুটে লজ্জার পরাজয়!