ব্যালন ডি’অর কে ফুটবলের অঘোষিত রাজমুকুট বললে মনে হয় না ভুল হবে। ব্যালন ডি’অরের মাধ্যমে বছরের সেরা ফুটবলার কে তা নির্বাচিত করা হয়। এটিকে ফুটবলারদের ব্যাক্তিগত সেরা অর্জন হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
মূলত ব্যালন ডি’অরের জন্ম হয়েছে ফ্রান্সের ম্যাগাজিন “ফ্রান্স ফুটবল” এর সম্পাদক গ্যাব্রিয়েল হান্তের হাত ধরে। ১৯৫৬ সালে তিনি চেয়ে ছিলেন প্রতি বছর ক্রীড়া সাংবাদিকদের ভোটের মাধ্যমে ইউরোপের সেরা ফুটবলার নির্বাচন করবেন। ১৯৫৬ সালে প্রথম বার ব্যালন ডি’অর জিতেন ইংলিশ ক্লাব ব্ল্যাকপুলের ব্রিটিশ ফুটবলার স্টানলি ম্যাথুস। প্রথমবার হওয়ায় এই ব্যালন ডি’অর প্রদান অনুষ্ঠানটি বেশ সাদামাটাভাবে শেষ করে গ্যাব্রিয়েল হান্তে।
বর্তমানে ব্যালন ডি’অর সকল দেশের ফুটবলারের জন্য উন্মুক্ত হলেও প্রাথমিকভাবে ব্যালন ডি’অর শুধুমাত্র ইউরোপিয়ান ফুটবলার যারা ইউরোপের লিগ খেলে তাদের জন্য ছিলো। তবে ১৯৯৫ সালে ব্যালন ডি’অর তাদের পুরস্কার প্রদানের নিয়মে পরিবর্তন আনেন। তখন ব্যালন ডি’অর ইউরোপসহ সকল মহাদেশের ফুটবলারদের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। তবে সেখানে ইউরোপের লিগ খেলার শর্তটি বহাল ছিলো। ২০০৭ সালে ব্যালন ডি’অর সকল দেশের ফুটবলার ও ক্লাবের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। প্রাথমিক অবস্থায় ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত যখন ব্যালন ডি’অর শুধুমাত্র ইউরোপের মাঝে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছিলো তখন অন্যান্য দেশ ও মহাদেশের ফুটবলারদের কথা ভেবে ফিফা বর্ষসেরা ফুটবলারের পুরষ্কার প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহন করেন। কারণ পেলে, গ্যারিঞ্চ, রোমেরো, ম্যারাডোনার মত সেরা ফুটবলাররা শুধুমাত্র লাতিন ফুটবলার হওয়ায় ব্যালন ডি’অর পায়নি। যদিও ২০১৬ সালে ব্যালন ডি’অর তাদের ৬০তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী অনুষ্ঠানে দক্ষিন আমেরিকা ছাড়া যে ৩৯ টি ব্যালন ডি’অর অনুষ্ঠান আয়োজন করেছিলো তার ১২ টিতে পেলে (৭ বার), ম্যারাডোনা(২বার), গ্যারিঞ্চা(১বার), মারিও কেম্পেস(১বার) এবং রোমেরো(১বার)কে বিশেষ ভাবে ব্যালন ডি’অর জয়ী বলে ঘোষণা করেন।
১৯৯১ সালে ফিফা বর্ষসেরা ফুটবলারের পুরষ্কার চালু করেন। প্রথমবারের মত ফিফা বর্ষসেরা পুরস্কার পায় ১৯৯০ বিশ্বকাপে জার্মান অধিনায়ক লোথার ম্যাথিউস। সে সময় থেকে ব্যালন ডি’অর ও ফিফা বর্ষসেরা পুরষ্কার দুটি ধারাবাহিক ভাবে চলতে থাকলেও ২০০৭ সালের পর দুইটির পুরষ্কার প্রদানের নিয়ম একই রকম হওয়ায় দেখা যেতো যে ব্যালন ডি’অর জয়ী হচ্ছে তাকেই পুনরায় ফিফা বর্ষসেরা ফুটবলার হিসেবে পুরষ্কৃত করতে হচ্ছে। পরবর্তীতে ফিফা ও ব্যালন ডি’অর কমিটি কথা বলে ২০১০ সাল থেকে ফিফা বর্ষসেরা ফুটবলার ও ব্যালন ডি’অরকে একত্রিত করেন। তখন ব্যালন ডি’অর এর নামকরণ করা হয় “ফিফা ব্যালন ডি’অর”।
ব্যালন ডি’অর ট্রফি কিসের তৈরি?
১৯৫৬ সালে যখন প্রথম ব্যালন ডি’অর প্রদান করা হয় তখন সর্ব প্রথম ব্যালন ডি’অরটি তৈরি করেন ফ্রান্সের সনামধন্য জুয়েলারি প্রতিষ্ঠান ‘মেল্লেরিও ডিটস মেল্লের’। ব্যালন ডি’অর ট্রফিটি মূলত একটি ফুটবল প্রতিকৃতি। যেটি দুইটি বেসে তৈরি করা হয়। গোলাকার ফুটবলটি একটি পাতের উপর বসানো থাকে। ব্যালন ডি’অর ট্রফিটি ৩১ সেন্টিমিটার প্রশস্ত এবং এটি ১৮ ক্যারট স্বর্ণ দিয়ে তৈরি করা হয়। ব্যালন ডি’অর জয়ের পর ট্রফির উপর খোদাই করে জয়ী ফুটবলারের নাম লিখে দেয়া হয়। পুরো ব্যালন ডি’অর ট্রফিটির ওজন ৫ কেজি।
কিভাবে ব্যালন ডি’অর জয়ী নির্বাচন করা হয়
ব্যালন ডি’অর জয়ী নির্বাচন করা হয় মূলত ভোটের মাধ্যমে। তবে এই ভোট অনুষ্ঠান সর্বসাধারণের জন্য নয়। এখানে ফিফার অন্তর্ভুক্ত ২০৯টি দেশের জাতীয় দলের কোচ ও অধিনায়ক ভোট দিতে পারবে। তবে দলের অধিনায়ক তার নিজেকে ভোট দিতে পারবে না তবে জাতীয় দল কিংবা ক্লাবের সতীর্থ ফুটবলারকে ভোট দিতে পারবেন এবং বিশেষ সাংবাদিকরা ব্যালন ডি’অর নির্বাচনে ভোট দেয়ার সুযোগ পেয়ে থাকেন।
সর্বোচ্চ ব্যালন ডি’অর জয়ী ফুটবলার কে?
সর্বোমোট ৬১ বার ব্যালন ডি’অর প্রদান অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছে। যার মধ্যে আর্জেন্টাইন ফুটবলার লিওনেল মেসি ও পর্তুগিজ ফুটবলার ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ৫ টি করে ব্যালন ডি’অর জয়ী হয়েছেন। এছাড়াও মিশেল প্লাতিনি, ইয়ুহান ক্রুইফ, মার্কো ফন বাস্তেন ৩ বার করে ব্যালন ডি’অর জয়ী হয়েছেন। যদিও ২০১৬ সালে বিশেষ ভাবে পেলেকে ৭ বার ব্যালন ডি’অর জয়ী ঘোষণা করা হলেও সেটি ব্যালন ডি’অর জয়ীদের তালিকায় হিসাব ভুক্ত করা হয়নি। কারণ সেই ব্যালন ডি’অরগুলোতে তাকে সে সময়ের ব্যালন ডি’অর জয়ীর বিকল্প জয়ী বলে ঘোষণা করা হয়।