লিখতে বসে এমন কখনো লাগে নাই। এতো বিরক্তি কখনো অনুভব করি নাই। জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে মাশরাফি সত্যই কিনলেন আওয়ামী লিগের মনোনয় ফর্ম! নড়াইল-২ আসন থেকে মাশরাফির আওয়ামী লীগের প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা আছে।মনোনয়ন ফরম কেনার আগে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গণভবনে যান। সেখানে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সালাম করে দোয়া নেন।
সরকার বৈধ কি অবৈধ এ আলোচনাগুলো রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাই করুক। আমি খেলার মাঠের মানুষ। তাই, রাজনীতির জটিল হিসাব কিতাব অতটা বুঝি না। স্বল্পজ্ঞানে যে টুকু বুঝতে পারছি তা হলো, মাশরাফি আর জাতীর থাকলেন না। হয়ে গেলেন একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠির। যার পক্ষে এত লিখেছি, যার বিপক্ষে হওয়া অন্যায়ে সব সময় সরব হয়েছি; তার এই সিদ্ধান্তটি আঘাত দিয়েছে তীব্রভাবেই। এইটুকু শুনেই আমাকে আওয়ামী বিরোধি ট্যাগ দিয়ে দিয়েন না। কেন, এমনটা লিখছি সেটা ব্যাখ্যার অধিকার আমার রয়েছে।
মাশরাফির রাজনীতিতে আসার পক্ষে যারা; তারা বলছেন ভালো মানুষ রাজনীতিতে আসা ইতিবাচক। হ্যাঁ, এটা সত্য। কিন্তু সব কিছুরই একটা সময় থাকে। একজন খেলোয়াড় পুরো দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন, একজন এমপি একটি নির্দিষ্ট দলের, যতক্ষণ না পর্যন্ত সে সরকারের অংশ হয়। মাশরাফি যে চলতি অবস্থায় মন্ত্রিত্ব পাবেন না এটা তো অনুমেয়ই। অতএব, তিনি দেশকে প্রতিনিধিত্ব করছেন সে কথা বলার সুযোগটা আর থাকছে না।
এখন যখন মাশরাফি দেশের জার্সি গায়ে মাঠে নামবেন তিনি কি হলফ করে বলতে পারবেন তিনি সমগ্র জাতিরই প্রতিনিধিত্ব করছেন? বললেও সেটি কি সবাই বিশ্বাস করবে? বাংলাদেশের সাধারন হিসাবে বিএনপি-আওয়ামীলীগের নির্দিষ্ট সমর্থক ত্রিশ থেকে পয়ত্রিশ শতাংশের ভিতরে। পুরো জাতির গৌরব এখন ত্রিশ শতাংশ জনতার প্রতিনিধিত্ব করবেন! এতদিনের যে ইমেজ, সেটি কি আগের মতই থাকবে? কোনো অবস্থাতেই না।
আরো একটি দিক থেকে এটা তো জনগনের সাথেও প্রতারণা হবে। একজন ক্রিকেটারকে অনেকটা সময়ই কাটাতে হয় মাঠে এবং দেশের বাইরে। তিনি যে আসন থেকে নির্বাচন করবেন, সে আসনের জনগণের যে প্রত্যাশা, যে তাদের নেতা সংসদে তাদের দাবি দাওয়া তুলে ধরবে, সেটি করার মতন যথেষ্ট সময় কি তিনি পাবেন? যদি তিনি জননেতা হওয়ার পূর্ণ শর্ত পূরণ করেন তাহলে জাতীয় দলকি তার কাছ থেকে প্রাপ্যটুকু পাবে? মাঠের মানুষ যতটা সময় মাঠের বাইরে কাটান ততটাই মরচে পরা শুরু করে তার নৈপুণ্যে।
যদি, এমন হয় যে, বর্তমান সরকারের চাপের সামনে নতি শিকার করে তিনি প্রার্থী হতে বাধ্য হয়েছেন তাহলেও তো প্রশ্ন থেকেই যায়। এবং এই কথাটাই উঠেছে, চাপের মুখে, গোয়েন্দা হুমকির মুখে বড় বড় তারকাদের এই আতঙ্কিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ব্যানারে অংশ নিতে অনেককে বাধ্য করা হচ্ছে।
নড়াইলের উন্নয়নে তার সংসদে যাওয়ার জারুরাত রয়েছে, সেটি তিনি স্বতন্ত্রভাবেই করতে পারতেন। তার বিএনপি বা আওয়ামীলীগের সামান্যতম সমর্থনেরও প্রয়োজন ছিল না। যাকে দলে নেয়ার জন্য পুরো জেলায় হরতাল পালন হতে পারে, সেই তাকে নড়াইবাসী মার্কা ছাড়া ভোট দিবে না এটা বিশ্বাস করার মত না। জনতার মাশরাফি বনাম লীগের মাশরাফি এই যুদ্ধটা শুরু হল।
মাশরাফির যে ইমেজ ছিল এতোদিন আর তার যে বিশাল সমর্থক গোষ্ঠী ছিল; তিনি যদি সাহসের সাথে না বলতেন তাকে বাধ্য করার সাধ্য কার ছিল? তখন বরং তিনি পরিণত হতেন আরো বড় এক আদর্শে। আর যদি পরিস্থিতি এমনই হয় যে, তাকে না বলার কোনো সুযোগই দেয়া হয়নি, তাহলে বোঝাই যায় বর্তমান অবস্থা কতটা ভয়াবহ। এই অবস্থায় তার নতি শিকার লজ্জারই বলা যায়
এই মানুষটাকে দলমত নির্বিশেষে সকলে ভালোবেসেছেন উজার করে। কিন্তু, সেই ভালোবাসার প্রাপ্য সম্মানটুকু তিনি দিতে পারলেন না আর। যে চোখগুলো তে অশ্রু ঝ’রতো তার নিবেদন দেখে সে চোখগুলো বোধ হয় বিশ্বাস করতে পারছেন না এমন কিছু। মাশরাফি যদি এমনটা ভেবে থাকেন যে, নড়াইলের উন্নয়নে তার সংসদে যাওয়ার জারুরাত রয়েছে, সেটি তিনি স্বতন্ত্রভাবেই করতে পারতেন। তার বিএনপি বা আওয়ামীলীগের সামান্যতম সমর্থনেরও প্রয়োজন ছিল না। যাকে দলে নেয়ার জন্য পুরো জেলায় হরতাল পালন হতে পারে, সেই তাকে নড়াইবাসী মার্কা ছাড়া ভোট দিবে না এটা বিশ্বাস করার মত না। জনতার মাশরাফি বনাম লীগের মাশরাফি এই যুদ্ধটা শুরু হল। মাত্র তো মনোনয়ন কিনলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি নির্বাচনে আসলেই হাজির হন কি না তা এখনই বলা যাচ্ছে না। তবে তাঁর মতো মানুষের কাছ থেকে আশা করার ছিল, তিনি রাজনীতি আসলে দল থেকে পদত্যাগ করেই আসবেন। কারণটা আগেই বলেছি। খেলার মাঠে আর রাজনীতির মাঠে এক সাথে কাজ করা যায় না। উচিতও নয়। তিনি দল থেকে ইস্তফা না দিয়ে মনোনয়ন কেনায় এটা অন্তত নিশ্চত করেই বলা যায় কাজটা মাশরাফি সুলভ হয়নি।
কষ্টের বিষয় হ বিশ্বাসটা মাশরাফি নিজেই রাখতে পারলেন না। জনতার থেকে হয়ে গেলেন লীগের। সেটিও এমন একটি সময় যখন বহিঃবিশ্বে পুরো দলটিরই ভাবমূর্তির সংকট রয়েছে। মাশরাফি কি মনে নিয়ে এই অবিশ্বাস্যকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুললেন সেটি তিনিই জানেন। কিন্তু, তার ওপর যে অকৃত্রিম ভালোবাসা ছিল, সেটি যে অনেকটাই থাকবে না সেটি নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।
বিধি এই যদি তোর মনে ছিল, এত কষ্ট করে নিজেকে নায়কের আসনে বসানো কেন? এই প্রশ্নটিই বারবার ঘুরপাক খাচ্ছে মনে।