বেরিল দেদেয়াগুলু একজন তুর্কি একাডেমিক এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তিনি সাবেক তুর্কি সরকারের ‘ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন অ্যাফেয়ার্স’ মন্ত্রী ছিলেন। নিয়মিত রাজনৈতিক কলাম লেখেন তুরস্কের জনপ্রিয় সংবাদপত্র ‘ডেইলি সাবা’য়। তুরস্কের ইস্তাম্বুলে অবস্থিত সৌদি আরবের কনসুলেট ভবনে নিখোঁজ হওয়া ওয়াশিংটন পোস্ট’র সাংবাদিক জামাল খাশোগি’র ঘটনার জের ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের বর্তমান সম্পর্ক ও সৌদি সরকারের বিরোধীদের উপর আগ্রাসনের উপর কলাম লেখেন তিনি। লেখাটি গতকাল, ৯ অক্টোবর ‘ডেইলি সাবা’র মতামত পাতায় প্রকাশিত হয়। এখানে জবানের পাঠকদের জন্য অনুবাদ করেছেন তুহিন মোহাম্মদ।
এটা সবারই খুব ভালো করে জানা যে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পছন্দের দেশগুলোর মধ্যে একটি সৌদি আরব। এটাও আমরা জানি, যুক্তরাষ্ট্রের পছন্দের হওয়া সাধারণ অর্থে ভালো কথা নয়। এমনকি যখন আপনার দেশ যুক্তরাষ্ট্রের পছন্দের হবে তার মানে এই নয় যে তারা আপনার দেশকে যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষ এবং সহযোগী মনে করে বরং সর্বদা আপনাকে নিকৃষ্ট মনে করে।
অতি সম্প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্প এক র্যালিতে বলেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহযোগিতা ছাড়া সৌদি বাদশা দুই সপ্তাহও টিকবে না। এই অকূটনৈতিক মন্তব্যের মানে, সৌদি আরব যদি অর্থ প্রদান না করে তাহলে তারা আর সৌদি আরবের সুরক্ষায় কোন ভূমিকা রাখবে না। ট্রাম্পের এই উক্তি থেকে আমরা বুঝতে পেরেছি যে, ট্রাম্প বিশ্বাস করে সৌদি সরকার খুব দুর্বল। এতই দুর্বল যে, যদি যুক্তরাষ্ট্র সেনাবাহিনী সৌদি রাজবংশকে রক্ষা না করে তবে মাত্র দুই সপ্তাহে তার পতন ঘটতে পারে। এই শব্দগুলো গুপ্ত হুমকির চেয়ে কোন অংশে কম নয়। আমরা এটা বুঝতে পেরেছি যে, যে মুহুর্তে রাজা সালমান ট্রাম্পের নির্দেশ অনুসরণ না করার সিদ্ধান্ত নেবে, ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সরকারকে সুরক্ষা দেয়া বন্ধ করে দেবে।
আমরা জানি, যুক্তরাষ্ট্র তার অপছন্দের সরকারকে হুমকি ও তার পতনের জন্য যে পদ্ধতিগুলো ব্যবহার করে, তার মধ্যে সেনা অভ্যূত্থানকে প্রায়ই ব্যবহার করতে দেখা গেছে। এটা স্বীকার করতেই হবে যে, এই পদ্ধতি কিছু ক্ষেত্রে কার্যকর প্রমানিত হয়েছে। সমস্যা হচ্ছে ট্রাম্প এই অঞ্চলে তার সবচেয়ে কাছের সহযোগীকে হুমকি দিয়েছে। তাহলে চিন্তা করুন, এটাই যদি ‘বন্ধু’র জন্য তার ব্যবস্থা হয়, তবে তিনি ‘শত্রু’র জন্য কি পরিকল্পনা করে রেখেছেন!
বর্তমানে সৌদি সরকারকে তার বিরোধীদের যে কোন মূল্যে নির্মূল করার দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ মনে হচ্ছে। বিরোধীদের সাথে মিলিত হবার পথ অনুসন্ধান কিংবা সমালোচকদের পরামর্শ শোনার পরিবর্তে সৌদি সরকার বিনাদ্বিধায় সব ধরণের সমালোচনাকে স্তব্ধ ও শেষ করে দেয়ার চেষ্টা করছে।
প্রতিক্রিয়া হিসেবে, সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান দাবি করেন, তার দেশ নিজেকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে পুরোপুরি সক্ষম। তিনি আরও বলেন, তাদের অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধের প্রয়োজন নেই, তারা যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে যে সামরিক সহায়তা পাচ্ছে তা ইতোমধ্যেই পরিশোধ করা হয়েছে। অন্য অর্থে তিনি কটাক্ষ করেন যে, ট্রাম্প তাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে মিথ্যাচার করছে।

আমরা জানি না, যদি যুক্তরাষ্ট্র এই সরকারকে সুরক্ষা দেয়া বন্ধ করে দেয় অথবা যদি সৌদির কাছে যুক্তরাষ্ট্রের টাকা পাওনা থেকে যায়। তবে, এটা খুবই মজার হবে যে, হেন কোন দেশ থাকলো যারা ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর অপমানিত হয়নি। সম্ভবত, ট্রাম্পের এই মন্তব্য সৌদি আরবকে ওয়াশিংটনের সাথে থাকা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে পুনঃবিবেচনার দিকে ঠেলে দিয়েছে। পাশাপাশি ট্রাম্পের এই মন্তব্যগুলো সৌদি আরব সম্পর্কে তাদের উৎসাহিত যারা ক্রাউন প্রিন্স সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করে আসছে; তারা এটাকে প্রমাণ হিসেবে ব্যাখ্যা করবে যে, ওয়াশিংটন তাদের ত্যাগ করতে প্রস্তুত।
এখন এটা প্রতীয়মান হয় যে, যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান সৌদি শাসনব্যবস্থার জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর সাম্প্রতিক ভুলগুলো সম্ভবত এই চাপের ফল। বর্তমানে সৌদি সরকারকে তার বিরোধীদের যে কোন মূল্যে নির্মূল করার দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ মনে হচ্ছে। বিরোধীদের সাথে মিলিত হবার পথ অনুসন্ধান কিংবা সমালোচকদের পরামর্শ শোনার পরিবর্তে সৌদি সরকার বিনাদ্বিধায় সব ধরণের সমালোচনাকে স্তব্ধ ও শেষ করে দেয়ার চেষ্টা করছে।
সৌদিরা এতই দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ যে, তারা আন্তর্জাতিক পরিণতির দিকে কোন মনোযোগ না দিয়েই তাদের সমালোচক নাগিরকদের খুঁজে বের করছে, যারা বিদেশে বসবাস করে। ওয়াশিংটন পোস্ট’র সাংবাদিক সৌদি নাগরিক জামাল খাশোগি নিঁখোজ হওয়ার ঘটনা বিশেষত অস্বাভাবিক। তিনি ইস্তাম্বুলের সৌদি কনসুলেট ভবনে প্রবেশের পর মুহূর্তেই নিখোঁজ হয়ে যান।
বিরোধীদের নির্মূলে তারা এতটাই সংকল্পবদ্ধ যে বিরোধীরা কোথায় আছে সে দিকে কোন নজর দেয়ার সময় নেই। এই শোডাউন সৌদি শাসকদের বিচারিক বিপাকে কিংবা নাজুক অবস্থানে ফেলে দিতে পারে। মনে হতে পারে সৌদিরা এখন আর এই পরিণতিকে কোন তোয়াক্কা করে না, কিন্তু একদিন তারা আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় আসবে।
সৌদি আরব প্রমাণ করতে চাইছে, বিরোধীদের নির্মূলে তারা এতটাই সংকল্পবদ্ধ যে বিরোধীরা কোথায় আছে সে দিকে কোন নজর দেয়ার সময় নেই। এই শোডাউন সৌদি শাসকদের বিচারিক বিপাকে কিংবা নাজুক অবস্থানে ফেলে দিতে পারে। মনে হতে পারে সৌদিরা এখন আর এই পরিণতিকে কোন তোয়াক্কা করে না, কিন্তু একদিন তারা আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় আসবে। তার চেয়ে ভালো, আরো সাবধানে কাজ করা।
এটি যুক্তরাষ্ট্ররে জন্যও জটিল পরস্থিতি। তারা কিভাবে এমন একটি রাষ্ট্ররে সাথে বন্ধুকে গ্রহণযোগ্যতা দেবে যারা কিনা বিশ্বব্যাপী বিরোধীদের অনুসরণ করছে এবং নির্মূল করে দিচ্ছে। এই ধরণের বন্ধুত্ব যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকে বিশ্বের কাছে প্রশ্নবদ্ধি করবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র অবশ্যই জানে, নিজেদের সহযোগীদের অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ পরিশেষে তাদের রাশিয়ার দিকে ঠেলে দেয়ার মতো।
আমরা একটি মজার সময় পার করছি যখন ওয়াশিংটন শুধু শত্রু নয় বন্ধুদেরও রাশিয়ার বাহুতে ঠেলে দিচ্ছে। আশাকরি সৌদি সে রকম কোন ফাঁদে পা দেবে না।