খাশোগির ঘটনায় যে অংশটুকু সুনিশ্চিতভাবে প্রমাণিত তা হচ্ছে, তিনি ২ রা অক্টোবর দুপুর একটার দিকে ইস্তাম্বুলের সৌদি কন্স্যুলেটে গিয়েছিলেন। এটা কন্স্যুলেটের কর্মকর্তারা স্বীকার করেছে। তাছাড়া, কন্স্যুলেটের বাইরের সিসি ক্যামেরার ছবি এবং ফুটেজেও তাকে কন্স্যুলেটে যেতে দেখা গিয়েছে। বিতর্কটা হচ্ছে এর পরের স্টেপ নিয়ে। সৌদি কর্তৃপক্ষ দাবি করছে তিনি কাজ সেরে ২০ মিনিটের মধ্যে বের হয়ে গিয়েছেন। তারপর তার কী হয়েছে সে ব্যাপারে তাদের কোন ধারণা নেই। কিন্তু তুরষ্কের জোর দাবি হচ্ছে খাশোগির কন্স্যুলেটে প্রবেশ করার সব ডকুমেন্ট আছে, কিন্তু বের হওয়ার কোন প্রমাণ নেই। সৌদি কর্তৃপক্ষকে প্রমাণ করতে হবে যে, তিনি বের হয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু সৌদি কর্তৃপক্ষ কেবল দাবিতেই সীমাবদ্ধ আছে। তাদের দাবির পক্ষে কোন প্রমাণ দেখায়নি এখনো পর্যন্ত।
এর মধ্যে কোনটাকে বেশি বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে? তুরস্কের বক্তব্যকে আপাতত সত্যের বেশি কাছাকাছি মনে হচ্ছে। খাশোগি কন্স্যুলেটের ভেতরেই কিডন্যাপ হয়েছেন। এখন কোথায় থাকতে পারেন এবং আদৌ জীবিত আছেন কি না তার নিশ্চিত কোন তথ্য নেই। তবে, কিডন্যাপ কেইসের একটা প্রকৃতি হচ্ছে কিডন্যাপের ২ দিনের মধ্যে ভিকটিমকে উদ্ধার করা না গেলে তার নিহত হওয়ার সম্ভাবনাই প্রবল। স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের এক কর্মকর্তা এমনটাই বলেছেন। তাই খাশোগির জীবিত না থাকার সম্ভাবনাই প্রবল। তাকে জীবিতাবস্থায় তুরস্ক থেকে বের করা খুব একটা অসম্ভব না, কিন্তু রিস্ক বেশি। সেই তুলনায় তাকে কনস্যুলেটে বা কন্স্যুলেটের বাইরে অন্যকোথাও নিয়ে হত্যা করা হতে পারে। আমেরিকায় বসবাসরত প্রবীণ আরব সাংবাদিক ড. উসামা ফওজীর কয়েকটি ভিডিও ক্লিপ দেখেছি। তিনি দাবি করছেন যে, কন্স্যুলেটের ভেতরেই তাকে হত্যা করা হয়েছে। প্রথমে জিজ্ঞাসাবাদের নামে অকথ্য টর্চার করা হয়। এমনকি তার হাত পায়ের আঙুল কেটে ফেলা হয়। পরে সেখানেই হত্যা করা হয়। আর এই পুরো ঘটনার নেতৃত্ব দিয়েছে একজন উর্ধ্বতন সৌদি কর্মকর্তা রিয়াদে বসে সরাসরি টিভি স্ক্রিনের মাধ্যমে। গোপন সোর্সরা এ ব্যাপারে তাকে নিশ্চিত করেছে বলে উসামা ফওজী দাবি করেছেন। তবে, সত্য ঘটনা কী তা জানতে আরও সময় লাগবে।
খাশোগির ভাগ্যে কী জুটেছে সে-ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া না গেলেও এই ঘটনার সাথে যে সৌদি আরব জড়িত তার সম্ভাবনাই প্রবল। তার বেশ কিছু কারণ আছে –
১.
ঘটনার শুরু থেকে সৌদি আরব খুবই শীতল প্রক্রিয়া প্রদর্শন করেছে। বেশ লম্বা একটি সময় পার হওয়ার পরেও সৌদি আরবের পক্ষ থেকে কোন সরকারি বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একটা ডোন্ট কেয়ার ভাব পরিলক্ষিত হয়েছিল। অথচ এটা অস্বাভাবিক। কারণ খাশোগি একজন গুরুত্বপূর্ণ সৌদি নাগরিক। হেভিওয়েট পার্সন হিসেবে তো বটেই, একজন সৌদি নাগরিক হিসেবেও সরকারের দায়িত্ব ছিল দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া। নিজেদেরই উল্টো তুর্কি কর্তৃপক্ষের উপর চাপ সৃষ্টি করা যে আমাদের এমন একজন নাগরিক নিখোঁজ হলো কিভাবে? তাছাড়া, সৌদি আরবের তো এটা না জানার কথা নয় যে, এমব্যাসি থেকে একজন দর্শণার্থীর গায়েব হওয়ার অভিযোগটি কতো মারাত্মক। তবুও কেন তাদের মধ্যে ভাবান্তর লক্ষ্য করা যায় নি?
২.
ঘটনার দিন থেকেই সৌদি কর্তৃপক্ষ একটা ধুম্রজাল তৈরি করার চেষ্টা করে। ওই দিনই সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ঘোষণা দেয়া হয় যে, ইন্টারপোলের মাধ্যমে আমরা অর্থ-জালিয়াতির ঘটনায় জড়িত একজন পলাতক আসামীকে সৌদি আরবে ফেরত এনেছি। এটা তারা বড় বড় ইন্টারন্যাশনাল নিউজ এজেন্সির মাধ্যমে হাইলাইট করে প্রচার করে। অথচ অর্থ-জালিয়াতির ঘটনায় পলাতক কোন আসামীকে ফেরত আনা নিতান্তই সাধারণ একটা ঘটনা। এটাকে এভাবে হাইলাইট করার কোন মানেই হয়না। পাশাপাশি তারা সেই ব্যাক্তির নাম পর্যন্ত প্রকাশ করেনি। বিজ্ঞ মহলের ধারণা হচ্ছে, তুর্কি গোয়েন্দা এবং নিরাপত্তাবাহিনীকে বিভ্রান্ত করতেই এই ঘটনা ফাঁদা হয়। যাতে এমব্যাসি এরিয়ার উপর থেকে তাদের দৃষ্টি ফেরানো যায়। এর দুই দিন পরে সৌদি আরবে খাশোগির ফ্যামিলির পক্ষ থেকে একটি বিবৃতি দেয়া হয়। বিবৃতিতে বলা হয় যে, “তারা এই ঘটনায় সৌদি কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের উপরই ভরসা করছে এবং দ্বিতীয় কোন পক্ষকে এতে নাক না গলানোর জন্য আহ্বান জানাচ্ছে।” বিবৃতির গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট ছিল, তারা দাবি করেছে, “খাদীজা নামে কোন নারীর সাথে খাশোগির কোন ধরণের সম্পর্কের কথা তারা জানেনা। তার দ্বিতীয় বিবাহের প্রচেষ্টা ব্যাপারেও তারা কিছু জানে না।” এটা সৌদি সরকারের একটা ছেলেমানুষী প্রচেষ্টা। কারণ, কারও বুঝতে বাকি থাকার কথা নয় যে, প্রশাসনের পক্ষ থেকেই জোর করে এধরণের বিবৃতি দিতে বাধ্য করা হচ্ছে। তাছাড়া ভিকটিমের ফ্যামিলির কথার উপর তো কিডন্যাপের মতো একটা ঘটনার তদন্ত নির্ভর করে না। এছাড়াও খাদীজার সাথে খাশোগির বিবাহ প্রচেষ্টার যথেষ্ট প্রমান তুর্কি কর্তৃপক্ষের হাতে আছে। ডেভিড ফ্রেডমেনসহ খাশোগির ঘনিষ্ট বন্ধুরা খাদীজার সাথে তার সম্পর্কের ব্যাপারে স্বীকারোক্তি দিয়েছে। এভাবে সৌদি কর্তৃপক্ষের এ ধরণের সন্দেহজনক গতিবিধি তাদের ব্যাপারে সন্দেহকে আরো দৃঢ় করে।
৩.
একটা কথা প্রসিদ্ধ যে, সৌদি আরব কয়েক হাজার সদস্যের একটি অনলাইন ফোর্স তৈরি করেছে। তাদের প্রত্যেকে টুইটার এবং অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ সাধ্যমে বিভিন্ন নামে শত শত ফেইক একাউন্ট চালায়। তাদের কাজই হচ্ছে বিশেষ করে টুইটারকে নিজেদের দখলে রাখা এবং জনমত তৈরি করার জন্য সরকারের নীতির পক্ষে জোর প্রচারণা চালানো। ঘটনার দিন থেকেই সৌদি নাগরিকদের টুইটারে একটা বিষয়েই ঝড় চলেছিল তা হচ্ছে, সৌদি আরব তার শত্রুদেরকে ছাড় দেয় না। আকাশে বা পাতালে যেখানেই থাকুক সেখান থেকে বের করে আনবে। তারপর তুরষ্ক আর কাতারকে নিয়ে বরাবরের মতো জঘন্য ভাষায় গালাগালি অব্যাহত রাখে। তারা এটাকে তুর্কি, ইরানি, কাতারি, ইখওয়ানি জোটের বিরুদ্ধে গ্রেট সৌদি আরবের একটা বিজয় বলে প্রচার করতে শুরু করে। যদিও সাধারণভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের স্ট্যাটাসের মাধ্যমে কোন দেশের নীতি বোঝা যায় না, কিন্তু সৌদি আরবের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি ভিন্ন। কারণ এখানে যাদের হাতে টুইটারের দখল তারা প্রায় সবাই রাষ্ট্রের বেতনভুগী অনলাইন ফোর্স।
৪.
উপরে যেগুলো বলা হয়েছে সেগুলো সন্দেহের মূল কারণ নয়; মূল কারণগুলোর মধ্যে আছে বেশ কিছু অস্বাভাবিক কর্মকাণ্ড যেগুলো ঘটনার পর থেকে তুরস্কে ঘটে চলেছে। প্রথমত, খাশোগি ঘটনার আরও এক সপ্তাহ আগে কনস্যুলেটে এসেছিলেন। তখন তাকে ফিরিয়ে দেয়া হয় এবং বলা হয় যে, অক্টোবরের ২ তারিখ দুপুর ১ টার দিকে আসবেন। কেন তাকে ওইদিন ফিরিয়ে দেয়া হয়েছিলো। তিনি তো এটেস্টেট করতে এসেছিলেন। এটা তো যেকোনো সময় করা যায়। তাহলে কি তাকে ওইদিন ফিরিয়ে দিয়ে এই ফাঁকে তাকে কিডন্যাপ করার প্লান সাজানো হয়েছিলো?
দ্বিতীয়ত, খাশোগি যে, কন্স্যুলেট ত্যাগ করেছেন সে ব্যাপারে কন্স্যুলেট কর্তৃপক্ষ কোন প্রমাণ দেখাতে পারছে না। সব চেয়ে হাস্যকর বিষয় হচ্ছে, যখন তাদেরকে সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখাতে বলা হয় তখন তারা প্রথমে বলেছে যে, আমাদের ক্যামেরাগুলো নষ্ট। পরে বলেছে, এই ক্যামেরাগুলো ভিডিও ফুটেজ ধারণ করে না, শুধু প্রয়োজন মুহুর্তে ছবি তোলা হয়। এই কথায় তো পুরো দুনিয়া থ মেরে গিয়েছে। যেখানে এই সময়ে একটি মুদির দোকানে ভিডিও ক্যাপাসিটির সিসি ক্যামেরা বসানো হয় সেখানে কন্স্যুলেটের মতো একটি ডিপ্লোমেটিক জোনে ভিডিও ক্যাপাসিটির সিসি ক্যামেরা বসানো হয়নি এই কথাটি বিশ্বাস করার মতো এতো সরল মানুষের জন্ম এখনো হয়নি। পরে সংশোধন করে আবার বলা হয় যে, ক্যামেরা ঠিক আছে, কিন্তু ওইদিন খাশোগির ঘটনাটি রেকর্ড করা হয়নি। এটাও একটা অবিশ্বাস্য ব্যাপার। কেন তখন ক্যামেরাগুলো বন্ধ রাখা হয়েছিল তার কোন যৌক্তিক ব্যাখ্যা তাদের কাছে নেই। এটাই সবচেয়ে বড় প্রমাণ যে, তারা কিছু একটা লুকাচ্ছে। তাছাড়া, কন্স্যুলেটের বাইরের সকল সিসি ক্যামেরায় খাশোগির প্রবশের ছবি কিংবা ফুটেজ আছে। কিন্তু স্বাভাবিকভাবে তার বের হওয়ার কোন ছবি বা ফুটেজ নাই।
তৃতীয়ত, আরেকটি জোরালো কারণ হচ্ছে, সেদিন দুইটি প্রাইভেট বিমানে চড়ে ডিপ্লোম্যাটিক পাসপোর্টধারী ১৫ জন সৌদি কর্মকর্তা ইস্তাম্বুলে আসে এবং খাশোগির অবস্থান করার মুহুর্তেই তারা কন্স্যুলেটে ঢুকে। গতকাল গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, সন্ধ্যা ৬ টার দিকে তারা সেখান থেকে বের হয়ে ৬টি কালো শ্যাডো দেয়া গাড়িতে চড়ে এমব্যাসি ত্যাগ করে। রাস্তার সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যাচ্ছে যে, তার মধ্যে ৫টি গাড়ি সোজা এয়ারপোর্টে গিয়ে পৌঁছে। তারপর ওই ১৫ জন আরোহী পূর্বের দুটি বিমানে চড়ে দ্রুত দেশ ত্যাগ করে। একটি বিমান আবুধাবি অভিমুখে রওয়ানা দেয়, সেখান থেকে জেদ্দা। আরেকটি মিশরের দিকে রওয়ানা দেয়। এমব্যাসি থেকে বের হওয়ার সময় তাদের কারো কারো হাতে কালো ব্যাগ ছিল। পরে তুর্কি গোয়েন্দারা প্রকাশ করেছে যে, এই ১৫ জন লোক ভুয়া পাসপোর্টধারী ছিল। তারা মূলত সৌদি নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্য। ধরণা করা হচ্ছে তারা মূলত সৌদি আরবের বিশেষ ডেথ স্কোয়াড। তাই
তুর্কি গোয়েন্দাদের জোরালো সন্দেহ হচ্ছে খাশোগিকে জীবিত বা মৃতাবস্থায় কনস্যুলেট থেকে বের করে নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে আরও একটা বিষয় সন্দেহজনক ঠেকেছে। তা হচ্ছে সৌদি কনস্যুলেটের মালিকানাধীন ২৪টি গাড়ির মধ্যে ৪টির কোন সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। এর সাথে কি ঘটনার কোন যোগসূত্র আছে? তাছাড়া, কোন কোন পোর্টালে দাবি করা হয়েছে যে, ওই দিন দুপুরের দিকেই কনস্যুলেটে কর্মরত তুর্কি কর্মচারীদেরকে ছুটি দিয়ে দেয়া হয়েছে। গতকাল আরেকটি ইন্টারেষ্টিং তথ্য বের হয়েছে। খাশোগি ডিজিটাল ওয়াচ ব্যবহার করতেন। এই ঘড়ির সাথে সংযোগ ছিল তার আইফোনের। এরকম ঘড়ির মাধ্যমে বিভিন্ন অডিও এবং ভিডিও সংযোগকৃত মোবাইলের মেমোরিতে রেকর্ড করা যায়। কনস্যুলেটে ঢুকার সময় তিনি আইফোনটি খাদীজার হাতে দিলেও ঘড়িটি খুলেননি, বরং সেটি পরেই ভেতরে ঢুকেন। ঘড়ি উদ্ধার করা না গেলেও মোবাইলটি এখন তুর্কি গোয়েন্দাদের হাতে। ধারণা করা হচ্ছে এই এই ঘড়ি এবং মোবাইল তুর্কি গোয়েন্দাদের কাছে অনেক কিছু পরিষ্কার করে দিয়েছে।
এভাবে সময় যত গড়াচ্ছে ততই সৌদি আরবের ব্যাপারে সন্দেহ জোরালো হচ্ছে। তুর্কি সরকার এবং গোয়েন্দারা প্রায় নিশ্চিত যে, সৌদি কনস্যুলেটেই তাকে হত্যা করা হয়েছে।
সৌদি আরব এবং আরব আমিরাতের রাজতন্ত্র দুনিয়ার সবচেয়ে নিকৃষ্ট রাজতান্ত্রিক শাসন। অন্যান্য রাজতান্ত্রিক দেশগুলোতে স্বল্প পরিসরে হলেও বিরোধী মত প্রকাশের একটা সুযোগ রাখা হয়। বেশ কয়েকটিতে সাংবিধানিক রাজতন্ত্র প্রচলিত আছে। সেখানে বৈধভাবেই সংসদে বিরোধী দল আছে। কিন্তু সৌদি আরব কখনোই বিরোধী মতকে সহ্য করেনি। এমন কি বিদেশের মাটিতেও ভিন্নমতাবলম্বীদেরকে হয়তো ভাড়াটে খুনী দিয়ে হত্যা অথবা কিডন্যাপ করার ইতিহাস তাদের বেশ পুরোনো।
দুই.
প্রশ্ন হতে পারে, সৌদি আরব কেন এই পদক্ষেপটি নিলো? এর অনেক কারণ আছে। কথা দীর্ঘ না করে কেবল পয়েন্টগুলো উল্লেখ করবো।
১.
সৌদি আরব এবং আরব আমিরাতের রাজতন্ত্র দুনিয়ার সবচেয়ে নিকৃষ্ট রাজতান্ত্রিক শাসন। অন্যান্য রাজতান্ত্রিক দেশগুলোতে স্বল্প পরিসরে হলেও বিরোধী মত প্রকাশের একটা সুযোগ রাখা হয়। বেশ কয়েকটিতে সাংবিধানিক রাজতন্ত্র প্রচলিত আছে। সেখানে বৈধভাবেই সংসদে বিরোধী দল আছে। কিন্তু সৌদি আরব কখনোই বিরোধী মতকে সহ্য করেনি। এমন কি বিদেশের মাটিতেও ভিন্নমতাবলম্বীদেরকে হয়তো ভাড়াটে খুনী দিয়ে হত্যা অথবা কিডন্যাপ করার ইতিহাস তাদের বেশ পুরোনো। ১৯৭৯ সালে প্রখ্যাত সৌদি বিরোধী নেতা নাসির আল সাঈদকে ফিলিস্তিনি পিএলওর গোয়েন্দাদের মাধ্যমে লেবানন থেকে অপহরণ করে সৌদিতে নিয়ে আসা হয়। অকথ্য নির্যাতন করা হয়। বর্তমান বাদশাহ সালমান নিজেই নাসির সাঈদকে ইন্টারোগেশন করেছিলেন বলে শ্রুতি আছে। পরে নির্যাতন করে আধমরা অবস্থায় হেলিকপ্টার থেকে নিচে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে তাকে হত্যা করা হয়। এর পরে মরক্কো থেকে আনেকজন বিদ্রোহী সৌদি প্রিন্সকে কিডন্যাপ করে সৌদিতে নিয়ে এসে গুম করে ফেলা হয়। সালমান ক্ষমতা নেয়ার পরে সুইজারল্যান্ডসহ ইউরোপের ৩ টি দেশ থেকে ৩ জন ভিন্নমতাবলম্বী সৌদি প্রিন্সকে কিডন্যাপ করা হয়। খাশোগি এই ধারায় নতুন যুক্ত হওয়া একটি নাম মাত্র। যদি সৌদি রাজতন্ত্র টিকে থাকে তাহলে এই লিস্টে প্রতিনিয়ত আরো নাম যুক্ত হতে থাকবে।
২.
খাশোগি সৌদি প্রশাসনের ভেতরের মানুষ। লম্বা একটা সময় ওয়াশিংটন এবং লন্ডনে সৌদি রাষ্ট্রদূত প্রিন্স তুর্কি আল ফয়সালের উপদেষ্টা ছিলেন। তাই সম্ভবত তার কাছে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ছিল যা প্রকাশ হয়ে পড়ার ভয় ছিল সৌদি কর্তৃপক্ষের। তাই তাকে সরিয়ে দেয়াটা তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।
৩.
ভেতরের বাইরের বিরোধী পক্ষকে এই ম্যাসেজ দেয়া যে, নতুন নেতৃত্ব কাউকে ছাড় দিতে রাজি নয়। যেখানেই থাকুক তাদেরকে খুঁজে খুঁজে হত্যা করা হবে। এটা মোটেও অকল্পনীয় নয়। ২০১৭ সালে বিন সালমানের উপদেষ্টা সাউদ আল কাহতানী প্রখ্যাত সৌদি ভিন্নমতাবলম্বী নেতা ড. সাদ আল ফাকীহের টুইটেই নিচে রিটুইট করে সরাসরি হত্যার হুমকি দিয়েছে। রিটুইটটি আমি স্বচক্ষে দেখেছি। এতো উঁচু মাপের একজন সরকারি কর্মকর্তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরাসরি কাউকে হত্যার হুমকি দেবে তা ভাবাও যায় না। তবে মধ্যযুগীয় রাজতান্ত্রিক দেশগুলোতে এগুলো সম্ভব হয়।
৪.
মুহাম্মাদ বিন সালমানের ব্যাক্তিগত দম্ভ অহংকারও একটা কারণ হতে পারে। তিনি নিজেকে আলেকজান্ডার প্রমাণ করার জন্য মরিয়া। সেটা তার বহু কার্যকালাপে স্পষ্ট। ট্রাম্প প্রশাসন এবং আমেরিকার ইহুদি লবির আনুকুল্য পাওয়ার পর তিনি নিজেকে একরকম আইনের উর্ধ্বে ভাবছেন। ইহুদিরাও তার আস্থার প্রতিদান দিয়েছে। ইয়েমেন এরকম ভয়াবহ গণহত্যা করেও তিনি পার পেয়ে যাচ্ছেন। এরকম যুদ্ধাপরাধ করার পরেও আমেরিকা, বৃটেন, স্পেন, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি সব দেশই দিব্যি অস্ত্র সরবারাহ করে চলেছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর কোন প্রতিবাদই কাজে আসছে না। নেপথ্যে ইসরাইল এবং ইহুদি লবি। তাই, স্বভাবতই তিনি ধীরে ধীরে আরো বেপরোয়া হয়ে উঠবেন, ধরাকে সরা জ্ঞান করবেন। এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই।
সৌদি আরব চতুর্মুখী চাপের সম্মুখীন হবে। এমনকি অর্থনৈতিক অবরোধের মুখোমুখিও হতে পারে। ইবনে সালমানের সংস্কার প্রচেষ্টার নামে পশ্চিমাদের খুশি করার সকল প্রচেষ্টা বৃথা যাবে। আসতে পারে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা। এর প্রভাব পড়বে ইয়েমেন যুদ্ধে। এমনিতেই লেজেগোবরে অবস্থা। অস্ত্রের জোগানের অভাবে নিশ্চিত পরাজয় বরণ করতে হতে পারে। ক্রাইসিসের মধ্য দিয়ে চলতে থাকা সৌদি অর্থনীতির চাকা আরো স্থবির হয়ে যেতে পারে।
তিন.
ঘটনার পর থেকে তুরস্কের ভূমিকা কেমন ছিল সেটা একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তুরস্ক প্রথমে চেষ্টা করেছিল যত সহজে পারা যায় ঘটনা চুকিয়ে ফেলতে। তাই তারা বিষয়টাকে হাইলাইট করেনি। এমনকি ওই দিন আল জাজিরাসহ বেশ কিছু চ্যানেলে জোরেশোরে প্রচার করা শুরু হলেও আনাদুলো এজেন্সি, টিআরটি ওয়ার্ল্ডের মতো তুরস্কের মেইনস্ট্রীম মিডিয়াগুলো এ ব্যাপারে নিরব ছিল। তুরস্কের জন্য এটা একটা উটকো ঝামেলা। ইদলিব, এস-৪০০, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এবং সদ্য তৈরি হওয়া অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে তারা এমনিতেই নাজেহাল। এই অবস্থায় এরকম একটি ঘটনা তাদের চিন্তার রেখাগুলোকে আরো গভীর করে তুলবে তাতে বিন্দু মাত্র সন্দেহ নাই। তাই তারা কোনভাবেই হার্ডলাইনে যেতে চাচ্ছিলো না। তদন্ত জারি থাকলেও ঘটনার পরে প্রায় দুই দিন পর্যন্ত সরাকারিভাবে কোন বিবৃতি দেয়া হয়নি। সর্বপ্রথম প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা ইবরাহীম কালেন বিবৃতি দিয়ে বলেন যে, খাশোগি কনস্যুলেটের ভেতরেই আছেন। তিনি বের হয়েছেন এমন কোন ডকুমেন্ট নাই। এটা একরকম সরাসরি সৌদি আরবকে অভিযুক্ত করা। এর পর তুরষ্কের নিরাপত্তাবাহিনীর গোপন সুত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্স সংবাদ প্রচার করে যে, খাশোগি হত্যা করা হয়েছে। তিনি এখন আর জীবিত নেই। এটা বাস্তবও হতে পারে, অথবা সৌদী কর্তৃপক্ষকে চাপে ফেলার একটা কৌশলও হতে পারে। যাতে তারা নিরবতা ভাঙ্গে। এর মধ্যে মোটামুটি সবাই ধরে নিয়েছে যে, ভিকটিম নিহত হয়েছে। এরপর শনিবার সন্ধায় প্রেসিডেন্ট এরদোগান সর্বপ্রথম বিবৃতি দেন। তিনি বলেন, “তুরষ্কের মাটিতে খাশোগির নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা খু্বই বেদনাদায়ক। তদন্ত এখনো জারি আছে। আমরা আশা করছি ইতিবাচকভাবে এই ঘটনা শেষ হবে। আমি নিজেই এই বিষয়টি তদারক করছি। তদন্তের ফলাফল যাই হোক, আমরা তা দুনিয়ার সামনে প্রকাশ করবো।” এই বিবৃতি আগের হিসাব নিকাশ পাল্টে দেয়। তখন মনে হচ্ছিলো খাশোগি নিহত হওয়ার তথ্যটি অকাট্য নয়। বরং তার বেঁচে থাকার একটা সম্ভাবনা আছে। পাশাপাশি সৌদি আরবকেও এই বার্তা দেয়া হয়েছে যে, তুরস্ক আর দশটি কিডন্যাপের মতো করে একে দেখছে না। বরং, সর্বোচ্চ মহল থেকে তদারকি করা হচ্ছে এবং ঘটনার স্পষ্ট সমাধান না হওয়া পর্যন্ত এই কেইস ক্লোজ করা হবে না। “তদন্তের ফলাফল যাই হোক আমরা তা দুনিয়ার সামনে প্রকাশ করবো” – এরদোগানের এই কথাটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। কারণ সাধারণত রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডগুলো নিয়ে কিছু দিন হৈচৈ হলেও শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন স্বার্থের দিকে তাকিয়ে সেগুলোর তদন্ত রিপোর্ট সীল গালা করে রাখা হয়। কেনেডি হত্যার রিপোর্ট তার একটি উদাহরণ। এই কথার মাধ্যমে এরদোগান সৌদিকে এই বার্তা দিতে চেয়েছে যে, কোন আপস রফার মধ্যে যাওয়ার ইচ্ছে আমাদের নাই।
এভাবে চলে আসছে। সোমবার এরদোগান হাঙ্গেরি সফরে যান। বুদাপেষ্টে সাংবাদিকদের সামনে বিবৃতি দিতে গিয়ে তিনি আগের চেয়ে স্বর অনেকটা কঠোর করেন। তিনি বলেন, “খাশোগি কনস্যুলেট থেকে বের হয়ে গিয়েছেন – এটা বলে সৌদি কর্তৃপক্ষ পার পেতে পারবে না। তাদেরকে প্রমাণ করতে হবে সেটা।” এভাবে তুরস্কের প্রতিক্রিয়ার মধ্যে একটা ধারাবাহিকতা ছিল। হুট করে সূর চড়া করেনি। এখনো পর্যন্ত তারা তদন্তের ফল প্রকাশ করেনি এবং কঠোর কোন সিদ্ধান্তে যাচ্ছে না।
তুরস্কের এরকম ধীর গতির এবং সতর্ক প্রতিক্রিয়ার অনেকগুলো কারণ থাকতে পারে। যেমন-
১. সৌদি আরবের সাথে সরাসরি সংঘাতে গেলে আরব বিশ্বের সাথে তুরস্কের সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
২. তুরস্ক সব সময় সৌদি আরবের সাথে সুসম্পর্ক ধরে রাখতে আগ্রহী। কাতার সংকটের মতো এতো জটিল একটি মুহুর্তে কাতারে সৈন্য পাঠিয়েও সৌদি আরবের সাথে সম্পর্ক ধরে রাখার যথাসাধ্য চেষ্টা করেছে।
৩. ঘটনাটি ঘটেছে সৌদি কনস্যুলেটে। এমব্যাসি এবং কনস্যুলেট যেকোন দেশের সার্বভৌম স্থান। এগুলো ডিপ্লোমেটিক প্রোটেকশন পেয়ে থাকে। সেখানে অন্য কোন রাষ্ট্রের কেউ অনুমতি ছাড়া ঢুকতে পারেনা। এই কারণে ঘটনার তদন্ত করা বেশ জটিল হয়ে উঠেছিল। এমনও হতে পারে যে, এখনো পর্যন্ত এমন কোন নিখুঁত প্রমাণ তাদের হাতে আসেনি যার দ্বারা সৌদি আরবকে সরাসরি দোষী সাব্যস্ত করা যায়।
এরদোগানের একটি বড় গুণ হচ্ছে তিনি সংকটকে নিজের ফেভারে ব্যবহার করতে সিদ্ধহস্ত। সমস্যাকে সুযোগে পরিণত করার বিশেষ গুণ তার আছে। ব্যর্থ সামরিক অভ্যূত্থান থেকে নিয়ে প্রায় সব ক্ষেত্রেই এর প্রমাণ পাওয়া গেছে। তাই এমন একটা সম্ভাবনা সামনে আসছে যে, এরদোগান এই ঘটনাকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করতে পারেন। সৌদি আরবকে বশ করে বড় কোন অর্থনৈতিক অথবা রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করতে পারেন। কাতার সংকটের সামাধান একটা ইস্যু হতে পারে।
চার.
ঘটনার সম্ভাব্য পরিনতি কেমন হতে পারে?
অপহরণের ধরণ এবং তদন্তের গতি প্রকৃতি দেখে মনে হচ্ছে খুব সুখকর ভাবে এর নিষ্পত্তি হবে না। ঘটনা ঘটানো সহজ, কিন্তু এর লাগাম নিজের হাতে ধরে রাখা সব সময় সম্ভব হয় না। কে ধারণা করেছিল যে, বসনিয়ার সারায়েভোতে অস্ট্রিয়ান যুবরাজের একটি হত্যাকাণ্ড একটি মহাযুদ্ধের জন্ম দেবে? কে ভেবেছিল যে, তিউনিশিয়ার এক নিরিহ লোকের আগুনে আত্মাহুতি দেয়ার ঘটনার পরিণতিতে সিরিয়ায় ৬ লক্ষ মানুষের প্রাণহানী ঘটবে? এটিও এমন একটি মারাত্মক ঘটনা যার ভয়াবহতা সম্ভবত যারা ঘটিয়েছে তারা কল্পনাও করতে পারেনি। এই ঘটনা যদি শেষ পর্যন্ত একটি আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেয় তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকবে না। তবে, রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই। অপ্রত্যাশিত অনেক কিছুই ঘটতে পারে।
সম্ভাব্য পরিণতি কেমন হতে পারে এ ব্যাপারে এরকম একটি ধারণা লাভ করা যেতে পারে
ক.
সৌদি আরবের প্রতিক্রিয়া দেখে মনে হচ্ছে, তারা এই ঘটনাকে খুব ছোট করে দেখেছিল। তুরস্ককে খুব একটা ভয় করেনি। কারণ তারা মনে করেছে যে, তুরস্ক এখন বিভিন্ন ঝামেলা জর্জরিত একটি রাষ্ট্র। এমতাবস্থায় ঘটনাটি ফাঁস হলেও তেমন কোন কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখাবে না। কারণ ইউরোপ আর আমেরিকার সাথে এরদোগানের শীতল সম্পর্ক চলছে। সিরিয়ায় রাশিয়ার চাপে আছে। এই অবস্থায় আরবদের সাথে আরেকটি নতুন ফ্রন্ট খোলার মতো সাহস তুরস্কের হবে না। কিন্তু এটা যে আঞ্চলিকতার গণ্ডি পেরিয়ে বৈশ্বিক রূপ নেবে সেটা হয়তো অপরিপক্ক তরুণ সৌদি নেতৃত্বের মাথায় আসেনি।
তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতি মারাত্মকভাবে প্র্যাগমেটিক। যেকোন কঠিন পরিস্থিতিতে সাপের মতো মুহুর্তেই চরম পরিবর্তন করতে পারে। এর প্রমাণ বহু ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে। তাছাড়া রাজনৈতিকভাবে দুনিয়ার সবচেয়ে অশান্ত এবং জটিলতম স্থান ইউরেশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের কেন্দ্রে অবস্থান করার কারণে প্রাকৃতিকভাবে দেশটিতে বৈচিত্রময় পররাষ্ট্রনীতি গড়ে উঠেছে। তার উপর এরদোগানকে বলা হচ্ছে আনাতোলিয়ার ফক্স। পর্যবেক্ষকদের মতে, এরদোগানের একটি বড় গুণ হচ্ছে তিনি সংকটকে নিজের ফেভারে ব্যবহার করতে সিদ্ধহস্ত। সমস্যাকে সুযোগে পরিণত করার বিশেষ গুণ তার আছে। ব্যর্থ সামরিক অভ্যূত্থান থেকে নিয়ে প্রায় সব ক্ষেত্রেই এর প্রমাণ পাওয়া গেছে। তাই এমন একটা সম্ভাবনা সামনে আসছে যে, এরদোগান এই ঘটনাকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করতে পারেন। সৌদি আরবকে বশ করে বড় কোন অর্থনৈতিক অথবা রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করতে পারেন। কাতার সংকটের সামাধান একটা ইস্যু হতে পারে। রাজনীতি স্বার্থের খেলা। এখানে সব কিছুই সম্ভব।
কিন্তু, বেশ কিছু কারণে এই সম্ভাবনাকে দূর্বল মনে হচ্ছে। তার কারণ –
১.
জামাল খাশোগি যদিও একজন লিবারেল মানুষ ছিলেন, তবে ইসলাম পন্থীদের প্রতি বরাবরই সহানুভূতিশীল ছিলেন। শেষের দিকে এসে ব্রাদারহুডের পক্ষে অনেক কথা বলেন। তাছাড়া, তিনি সেসব প্রভাবশালী সৌদি কর্মকর্তাদের একজন ছিলেন যারা তুরস্কের প্রতি সব সময় মনোভাব পোষণ করেন। এরদোগানের সাথে তার অনেকবার সাক্ষাৎও হয়েছে। সেদিনের বিবৃতিতে এরদোগান তাকে বন্ধু বলে সম্বোধন করেছিলেন। এরদোগান ছাড়াও তুরস্কের প্রচুর প্রভাবশালী নেতাদের সাথে তার ঘনিষ্টতা ছিল। এসব বিবেচনায় বলা যায় যে, অন্তত খাশোগির এই ঘটনাকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হবে না।
২.
তুরস্ক একটি বৈদেশিক বিনিয়োগ নির্ভর, উদীয়মান শিল্পোন্নত রপ্তানীমুখী অর্থনীতির একটি দেশ। পাশাপাশি পৃথিবীর শীর্ষ পর্যটননির্ভর দেশগুলোর একটি। এসব দেশের অর্থনীতির সাথে নিরাপত্তার বিষয়টা অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত থাকে। রাস্তার পাশে পুঁতে রাখা একটি নিরিহ মাইনের বিষ্ফোরণও এসব দেশের স্টকএক্সেঞ্জে ধস নামায়। তাই তুরস্ক কোনভাবেই চাইবে না এই ঘটনাকে ধামাচাপা দিতে। বরং নিখুঁত তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীকে খুঁজে বের করে নিজেদের নিরাপত্তা ব্যাবস্থার কার্যকারিতা প্রমাণ করতে চাইবে।
৩.
আরব বসন্তের রাষ্ট্রগুলোতে পাল্টা অভ্যূত্থান হওয়ার পরে বিপ্লবের পক্ষের বড় বড় নেতারা এবং ব্রাদারহুডসহ পলিটিক্যাল ইসলামের প্রথমসারির প্রায় সব নেতা তুরস্কে রাজনৈতিক আশ্রয়ে আছে। এমতাবস্থায় খাশোগির এই ঘটনাকে শীতল ভাবে নিলে মিশরসহ অন্যান্য রাষ্ট্রের জন্যও তুরস্কের মাটিতে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের দরজা খুলে দেয়া হবে। প্রখ্যাত ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড হারেৎজ এ ব্যাপারে কথা বলতে গিয়ে এই বলেন, এতে করে অল্প কিছু দিনের মধ্যেই তুরস্ক অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে। গুপ্তহত্যার দরজা খুলে যাবে। এই ব্যাপারটি তুর্কি সরকারের কর্মকর্তাদের মাথায় থাকবে না সেটা আশা করা যায় না। অতএব, তুরস্কের নিরাপত্তার স্বার্থে হলেও এই ঘটনার কঠোর জবাব দিতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে অন্য কোন রাষ্ট্র এ ধরণের দূর্বৃত্তপণার সাহস দেখাতে না পারে।
৪.
এই ঘটনার মাধ্যমে মূলত তুরস্ককে এক প্রকার হেয় করা হয়েছে। খাশোগি এতো দিন আমেরিকায় ছিলেন। বহুবার লন্ডনসহ ইউরোপের বহু দেশে গিয়েছেন। কিন্তু কোথাও তার গায়ে হাত দেয়ার সাহস করেনি কেউ। কারণ সেসব দেশের সরকারকে তারা ভয় করেছে। যখনি তুরস্কে এসেছে সাথে সাথে সুযোগকে কাজে লাগিয়েছে। তার মানে, তুর্কি সরকারের প্রতিক্রিয়া নিয়ে তেমন মাথা ঘামায়নি। এই চড়টা ফিরিয়ে দেয়াটা তুরস্কের একটা দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। তাই এই মোক্ষম সুযোগটা তুরস্ক হাতছাড়া করবে বলে মনে হয় না।
খ.
যদি তদন্তে সৌদি আরবের জড়িত থাকার প্রমাণ উঠে আসে তাহলে দেশটিকে সরাসরি দায়ী করবে। যদি শেষ পর্যন্ত এতদূর গড়ায় তাহলে সেটা অকল্পনীয় মুসিবত ডেকে আনবে দু’দেশের জন্য। এর সম্ভাব্য পরিণতি কী হতে পারে সে ব্যাপারে ধারণা একটু দেয়া যেতে পারে।
১.
সৌদি আরবকে আনুষ্ঠানিভাবে দায়ী করার মানেই হচ্ছে দেশটির বিরুদ্ধে কূটনৈতিক যুদ্ধ ঘোষণা করা। কারণ, তুরষ্ক সাথে সাথেই দায়ী ব্যাক্তিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করবে এবং সৌদি আরবকে বলবে তাদেরকে তুরস্কের হাতে তুলে দেয়ার জন্য। এটা স্বাভাবিকভাবে সৌদি আরব প্রত্যাখ্যান করবে। ফলে দু’দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক সম্পূর্ণ ছিন্ন হয়ে যেতে পারে। দুটি বন্ধুপ্রতীম রাষ্ট্র মুহুর্তেই পরস্পর শত্রুতে পরিণত হতে পারে।
২.
স্বাভাবিকভাবে তুরষ্ক হাতগুটিয়ে বসে থাকবে না। কূটনৈতিকভাবে সৌদি আরবকে শায়েস্তা করার জন্য প্রয়োজনীয় সব কিছু করবে। প্রথমেই জাতিসংঘের দারস্ত হবে। তারপর আন্তর্জাতিক আদালতে এমনকি বিন সালমানের বিরুদ্ধেও মামলা করতে পারে। ইউরোপ এবং আমেরিকার সরকারদের কাছে ঘটনার তদন্তের বিস্তারিত ডকুমেন্ট পেশ করে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে ব্যাবস্থা নেয়ার আহ্বান জানাতে পারে। পশ্চিমারা আদর্শের কারণে না হলেও মিডিয়া এবং জনমতের চাপে পড়ে সৌদির বিরুদ্ধে ব্যাবস্থা নিতে বাধ্য হতে পারে। এমন কি এর জের ধরে সৌদি আরবের সিংহাসনেও পরিবর্তন আসতে পারে। অলরেডি প্রভাবশালী মার্কিন সিনেটররা সেই হুমকি দিয়ে রেখেছে। সিনেটর লিনডসে গ্রাহাম বলেছেন, যদি এই ঘটনায় সৌদি আরবের জড়িত থাকার প্রমান মেলে তাহলে তা সৌদি মার্কিন সম্পর্কের ধংসের জন্য যথেষ্ট হবে। এজন্য দেশটিকে অর্থনৈতিক ছাড়াও আরও বহু মুল্য দিতে হবে।
৩.
সৌদি আরব চতুর্মুখী চাপের সম্মুখীন হবে। এমনকি অর্থনৈতিক অবরোধের মুখোমুখিও হতে পারে। ইবনে সালমানের সংস্কার প্রচেষ্টার নামে পশ্চিমাদের খুশি করার সকল প্রচেষ্টা বৃথা যাবে। আসতে পারে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা। এর প্রভাব পড়বে ইয়েমেন যুদ্ধে। এমনিতেই লেজেগোবরে অবস্থা। অস্ত্রের জোগানের অভাবে নিশ্চিত পরাজয় বরণ করতে হতে পারে। ক্রাইসিসের মধ্য দিয়ে চলতে থাকা সৌদি অর্থনীতির চাকা আরো স্থবির হয়ে যেতে পারে। আরও কতো মূল্য যে দিতে হয় সেটা সময়ই বলে দিবে।
৪.
তুরস্কের জন্যও এই ঘটনা অনাকাঙ্খিত মুসিবত ডেকে আনবে। অরবদের মধ্যে তুরস্কে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ সৌদি বিজন্যাসমেনদের। দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন হলে তুরস্ক বড় অংকের বিনিয়োগ থেকে বঞ্চিত হবে। শুধু সৌদি আরবই নয়, অন্যান্য আরব দেশের সাথেও তুরস্কের সম্পর্কের অবনতি হতে পারে। সেই সাথে এসব অঞ্চলে তুরস্কের বাজার মারাত্মক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। এর প্রভাব পড়বে সাম্প্রতিককালে সমস্যায় জর্জরিত তুর্কি অর্থনীতির উপর।
এভাবেই মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে দুটি প্রভাবশালী দেশ কৃষ্ণগহ্বরে ঢুকে যেতে পারে। পর্দার আড়ালে থেকে যারা কলকাঠি নেড়েছিল তাদের উদ্দেশ্য সফল হবে। অপরিপক্ক, তরুন, আবেগী, অহংকারী ও দাম্ভিক নেতৃত্বের অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ডের খেসারত দিতে হবে মুসলিম জাতির বিরাট সংখ্যক একটি অংশকে।