টাইগার এখন আর বিড়াল নেই

টাইগার এখন আর বিড়াল নেই

বিশ্বের ক্রীড়া জগতে অংশ নেয়া প্রত্যেকটি দলেরই একটি ডাকনাম রয়েছে। বিভিন্ন ভাবে, বিভিন্ন কারণ মাথায় রেখে নির্ধারণ করা হয় নামগুলো। তেমনি করে ক্রিকেট বিশ্বে বাংলাদেশ পরিচিত টাইগার নামে।

জানা কথার জিকর করে বিরক্ত করার ইচ্ছে নেই। একটা সময় ছিল, যখন এই টাইগার নামটা পরিণত হয়েছিল পরিহাসের বিষয়ে। প্রতিপক্ষের বেধড়ক পিটুনি খেয়ে টাইগার যে বিড়ালে পরিণত হয়েছে এমন কার্টুনও ছাপা হয়েছে এদেশেরই গণমাধ্যমে। সদ্য সমাপ্ত এশিয়া কাপটি যেন ছিল সে পরিহাসের দাঁতভাঙ্গা জওয়াব দেয়ার এক আসর।

ক্রিকেটীয় দৃষ্টিকোণ থেকে না, আমি আলোচনাটা করব খেলোয়াড়দের মানসিকতা নিয়ে। যা মুগ্ধ করেছে সকলকেই। তামিম যদি তন্ময় করার কর্মটি শুরু করে থাকেন শেষটা করেছেন যথারীতি মাশরাফি। পঞ্চপাণ্ডবের বাকি তিনজনও পিছিয়ে থাকেননি। একজন ভাঙ্গা পাজড় নিয়ে পিষে মেরেছিলেন লঙ্কানদের। আরেকজন পিঠের চোট নিয়ে লড়াই করেছেন ফাইনালের শেষ বলটি পর্যন্ত। আর সাকিবতো ক্যারিয়ারের মায়াই প্রায় বিসর্জন দিয়ে হয়ে রয়েছেন হসপিটাল বন্দি। বৈশ্বিকও না, মহাদেশীয় আসরের শ্রেষ্ঠত্বের জন্য নিজেদের এভাবে আর কোন দল নিংড়ে দিয়েছে জানা নেই।

প্রথম ম্যাচেই বিপত্তির শুরু। কব্জি ভেঙ্গে পিচের বদলে ড্রেসিংরুমে তামিম। মোস্তাফিজ যখন ফিরে যাচ্ছেন, তখনো চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়ার মতন পুঁজি জমা হয়নি বোর্ডে। সবাইকে অবাক করে তামিম এক হাতে যখন ব্যাট হাতে নামলেন দলকে রক্ষায় তখন শ্রদ্ধায় স্যালুট জানিয়েছেন অনেকেই। বন্ধুকে ক্যারিয়ারের ঝুঁকি নিয়েও নামতে দেখে আচমকাই মুশফিক যেন পরিণত হলেন অশুরে। তাতে লঙ্কা দেখল বিস্ময়কর প্রলয়। ম্যাচ শেষে জানা গেল, প্রলয়ের জন্মদাতা নিজে শুধু প্রতিপক্ষের সাথেই না, লড়ছিলেন ভাঙ্গা পাজড়ের সাথেও! সাথে যোগ করুন বিরূপ কন্ডিশন!

দেশ ছাড়ার আগেই জানা গিয়েছিল সাকিবের আঙুলের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তবু, আমিরাতে গিয়ে সে আঙুল নিয়েই লড়েছেন জী-জান দিয়ে। ব্যাট হাতে হয়ত সে অর্থে নামের প্রতি সুবিচার করতে পারেননি, কিন্তু বল হাতে ঠিকই রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। ব্যাট হাতে তার ব্যার্থতার সমালোচনা করার বদলে অমন অবস্থায় যে ক্রিজে গিয়ে পেস বলের মুখোমুখি হবার হিম্মত দেখিয়েছেন এই তো ঢের।

তামিম-মুশফিকরার যখন মুখতালিফ গড়ার ব্রত্য নিয়েছেন তখন সমস্ত কায়ানাতের যিনি অনুপ্রেরণা তিনি চুপ থাকেন কি করে? পাকিস্তানের বিপক্ষে বাঁচা মরার ম্যাচে ম্যাচ যখন ছুটে যায় যায় তখনই অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতায় লুফলেন মালিকের ক্যাচটি। ক্যাচটি কতখানি অবিশ্বাস্য ছিল তা মালিকের চোখের আলফাজেই স্পষ্ট বোঝা গিয়েছে। কিন্তু, অবিশ্বাস্যকে বাস্তবে রূপ দিতে গিয়ে চোট বাঁধালেন আঙুলে। ফলশ্রুতিতে কিছুক্ষণের জন্য ছাড়তে হল মাঠ। মাশরাফিকে যারা নিয়মিত অনুসরণ করেন তাদের মনের অবস্থা তখন সহজেই অনুমেয়।

তিনি তো মাশরাফি, কিছুক্ষণ পরেই দেখা গেল বান্দা ব্যান্ডেজ সমেত মাঠে হাজির। সে ব্যান্ডেজ বাঁধা আঙ্গুল নিয়ে বোলিং করলেন, ক্যাচ ধরলেন, এমন কি একটি রান বাঁচানোর জন্য একাধিকবার ঝাঁপও দিলেন। প্রত্যেকবার বল হাত ছোঁয়ার সাথে সাথেই ব্যাথার আভাসটা মুখে দেখা যাচ্ছিল স্পষ্ট। তবু, তিনি তো মাশরাফি; তাই শেষ বল পর্যন্ত মাঠে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন দলকে।

শেষটা যখন মাশরাফিতেই হলো, তখন মাশরাফির একটি ঘটনার জিকর করি। ঘটনাটি ছিল সম্ভবত ‘১৫ এর বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। একটি রান বাঁচানোর জন্য বাবা-মায়ের আদরের কৌশিকের কৌশিশ দেখে ধারাভাষ্যকার মুগ্ধ স্বরে বলেছিলেন, দু হাটুতে সাতটি অস্ত্রোপচার নিয়েও যখন একজন আদমি, দলের নেতা; মাত্র একটি রান বাঁচানোর জন্য যখন নিজের সবটুকু বিলিয়ে দেন, তখন সেই অরা সবার মাঝে অণুরিত হতে বাধ্য।

মাঝে কেটে গেছে তিনবছর। সেদিনের মাশরাফির সে ঘটনাটি খেলোয়াড়দের মনে কতটা দাগ কেটেছিল সেটার প্রমাণ এবারের এশিয়া কাপ। আপনি যদি বলেন যে, মাশরাফির কৃতিত্বকে বড় করে দেখানোর একটি ঐচ্ছিক প্রয়াস আমি চালাচ্ছি তাহলে বলতে হয় আপনি হীনমন্যতায় ভুগছেন। পঙ্গুত্বের ঝুঁকি থাকার পরেও দেশের জন্য যে জান বাজি রেখে খেলা যায় সেটি সর্বপ্রথম দেখিয়েছেন এই মাশরাফিই। যে রাওয়্যাইত এখন বহন করেছেন মুশফিক-তামিম-সাকিবরা।

মোস্তাফিজকেই বা বাদ দিবেন কিভাবে? আড়ষ্ট হাত নিয়েও আফগানদের পরাজিত করার মূল নায়ক তো তিনিই। এক সময় পরিহাসে পরিণত হওয়া টাইগার নামটি নিয়ে এখন গর্ব করাই যায়। ক্রিকেটিয় দিক বাদই দিন, শুধু মাত্তর দেশের জন্য নিজের ক্যারিয়ার, জীবনের ঝুঁকি নেয়ার যে নজির এবার তামিমরা দেখিয়েছেন তাতে যদি বলি যে, আর যদি তারা কিছু নাও করেন তবু বাংলার ক্রিকেট ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবেন এই নিবেদনের জন্য সেটি মোটেও অতিশয়োক্তি হবে না। বলতেই হচ্ছে টাইগার এখন আর বিড়াল নেই। বরং, আহতাবস্থায়ও প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করার কৌশলটি রপ্ত করেছে বেশ ভালো ভাবেই।