বাফুফের ব্যর্থতা ঢাকল জাফরের ‘ফুটবল ইজ ইন আওয়ার হার্ট‌’

বাফুফের ব্যর্থতা ঢাকল জাফরের ‘ফুটবল ইজ ইন আওয়ার হার্ট‌’

প্রত্যেকটি নতুন প্রজন্মই পুরোনো প্রজন্মের কিছু সুখকর স্মৃতির গল্প শুনে বড় হয়ে থাকে। আবার একই সাথে নতুন প্রজন্মকে পুরোনো প্রজন্মের কিছু প্রথা জিইয়ে রাখতে না পারার টিপ্পনি শুনেই বড় হতে হয়। এই সিলসিলা বহুকাল ধরেই চলে আসছে, চলবেও।

বাংলাদেশের মানুষ ফুটবল পাগল। এক সময় ঢাকার মাঠ দর্শকে কেমন ঠাসা ছিল সে গল্প শুনেই এ প্রজন্ম বড় হয়েছে। সে সময়কার দর্শক, খেলোয়াড় থেকে শুরু করে ফুটবল সংশ্লিষ্ট সবার কন্ঠেই ঝড়ে পরে একটা হতাশা, এ প্রজন্ম বড্ড মাঠ বিমুখ। মেসি-রোনালদোদের নাম তারা মুখস্ত-কন্ঠস্ত করে রাখলেও নিজ দেশ নিয়ে এরা উদাস। সত্যিই কি তাই?

অন্তত এবারের সাফ গেমসের দর্শক সমাগম সেটি বলার ক্ষেত্রে বেশ বড় বাধা হয়ে দাড়াচ্ছে। বিশেষ করে নেপাল-বাংলাদেশের মধ্যকার ম্যাচটি। ম্যাচ শুরুর আগে থেকেই তিল ধারণের জায়গা ছিল না বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে। এবং, বিশেষ করে যেটি নজর কেড়েছে; উপস্থিত দর্শকদের একটি বিশাল অংশই কলেজ-ভার্সিটি পড়ুয়া ছাত্র। যারা নিয়ত মেসি-রোনালদোদের খেলা দেখে অভ্যস্ত। অনেককে প্রশ্ন করে জানা গেল তারা শুধু মেসি রোনালদোই না, চেনেন জামাল ভুঞা, সুফিল, সাদদেরকেও।

বিশাল সংখ্যক এই তরুণ দর্শক জমায়াতের পিছনে অন্যতম কারিগর ফেসবুকে বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় গ্রুপ ‘ফুটবল ইজ ইন আওয়ার হার্ট’ এবং এর প্রাণ পুরুষ জাফর হোসেন। তিনটি ম্যাচেই তিনি সদলবলে খেলার মাঠে হাজির হয়েছেন শ তিনেক দর্শক নিয়ে। গতকালও গ্যালারির একটি অংশ ব্যান্ড বাঁজিয়ে, চিৎকার করে টানা সমর্থন জুগিয়ে গিয়েছেন বাংলাদেশ দলকে।

ম্যাচ শেষে ম্লান মুখে কথা জাফর হোসেনের সাথে। তিনি জানান, হার্ট ২০১২ সাল থেকেই বাংলাদেশের ফুটবলের জন্য নিরবে কাজ করে যাচ্ছে। এবারের সাফ গেমসের বাংলাদেশের প্রতিটা ম্যাচে তারা দলকে সমর্থন জুগিয়েছেন মাঠে বসে। বাংলাদেশ সেমি এবং ফাইনালে উঠবে আশা করে নিয়ে রেখে ছিলেন আরো বড় পরিকল্পনা। খেলোয়াড়রা সে পরিকল্পনায় জল ঢেলে দেয়ায় জাফর হোসেনের চেহারায় কষ্টের ছাপটা পড়া যাচ্ছিল বেশ সহজেই।

আক্ষেপের সাথে তিনি বলেন, বোর্ডের সাথে জড়িত কর্তাদের কর্মগুণে নয়, বরং ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপের উদ্যোগের কারণেই এই ব্যাপক জন-সমাগম। তিনি বলেন, এই যে কষ্ট করে দর্শক টেনে আনা, এতে নিজের বা গ্রুপের কি লাভ? আমরা আসি দেশকে ভালোবাসি বলে, দেশের ফুটবলকে ভালোবাসি বলে। এত কষ্টের পর দল যখন জেতে তখন কোনো কষ্টই আর কষ্ট থাকে না। অথচ, নেপালের বিপক্ষে নূণ্যতম লড়াই ছাড়া পরাজয়টা বুকে গিয়ে বিধেছে। হারলেও, দল যদি সামান্য লড়াই করেও হারত তাতেও আফসোস ছিল না।

ফুটবল নিয়ে, বিশেষ করে শুধুই ভার্চুয়াল জগতে সীমাবদ্ধ না থেকে গ্রুপের সদস্যদের নিয়ে নিয়মিত ফুটবল ম্যাচ আয়োজন, বড় পর্দায় একসাথে ম্যাচ দেখা সহ ফুটবলের জন্য নীরবে অনেক কিছুই করে যাচ্ছে হার্ট। সামনে বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রথম পূর্ণাঙ্গ একটি ফুটবল ম্যাগাজিন প্রকাশের কথাও জানান তিনি। আরো বহু স্বপ্নই হার্টের রয়েছে বাংলাদেশের ফুটবলকে নিয়ে।

পরিতাপের বিষয় হলো, কথিত বড় সংগঠকরা যখন নিজেদের আখেড় গোছাতে ব্যস্ত তখন জাফর হোসেনের মতন তরুণ উদ্যোক্তাদের নেয়া উদ্যোগের প্রতিও সামান্য সম্মান দেথাতে পারল না মামুনুল-ওয়ালিরা। তবু, জাফর হতাশ হন না, বড় কিছু স্বপ্ন নিয়েই তিল তিল করে গড়ে তুলেছেন হার্টের বিশাল জগত।

নতুন প্রজন্ম যে মাঠবিমুখ বা বাংলাদেশের ফুটবল নিয়ে উদাসীন, এটা যে শুধুই কথার কথা তার প্রমাণ দিয়েছে হার্ট। এ গ্রুপ গুলোতেই রয়েছে অসংখ্য প্রতিভাবান সংগঠক, সদস্যদের মাঝে রয়েছে অনেক মেধাবী ফুটবলার। বধির বাফুফে এদের কথা কখনো শুনেনি, অন্ধ চোখে দেখেও দেখেনি। আধাঁরের রাজ্যে হতাশামাখা মুখটা নিয়েও যে আলো হয়ে জ্বলছিলেন জাফর। এদের মতন মানুষ থাকতে এদেশের ফুটবল এত সহজে মরবে না।