সৌম্য একজন দুধভাত

সৌম্য একজন দুধভাত

একটু পেছনের জামানার গল্প দিয়েই শুরু করি। যে জামানাটা ছিল আমার ভীষণ প্রিয়, যার প্রতিটি পাল আমি এখনো অনুভব করি। যেহেতু খেলার মাঠের মানুষ, স্মৃতির বেশি অংশজুড়েই যে সবুজ আসমানের প্রাধান্য থাকবে সেটাই স্বাভাবিক।

গাও-গেরামের খেলার আইন তো আর আইসিসির কেতাদুরুস্ত আইনের মতন না, যে লিখছে সেও বোঝে না; যার জন্য লেখা হয়েছে তারও মাথার তিন হাত উপর দিয়ে যায়। গাও-গেরামের খেলার আইন ছিল গা জোয়াড়ি, জোর যার মুল্লুক তার। প্রতিদিনই দেখা যেত দুই দল ভাগ হয়ে যাবার পরেও একটা বেহুদা বাকি থাকত। গ্রামের ভাষায় যারে বলত দুধ-ভাত। এই দুধ-ভাত ছিল ব্যাপক এক প্যারার নাম। শেষ পর্যন্ত মধ্যস্ততা হতো যে, বান্দা দুই দলেই ফিল্ডিং করবে নসিব ভালো হইলে ব্যাটিংও পাইতে পারে।

আচমকা দুধভাতের কথা ইয়াদে আসল কেন সেইটা পরিষ্কার করি এবার। পাড়া মহল্লার দুধভাতের সংস্কৃতি বজায় রাখার একটি বিশাল তাগিদ যে আমাদের নির্বাচকগণ অনুধাবন করেছেন সেটি অনেকদিনই বোঝা যায়নি। তাই বেহুদা বিরুপ সমালোচনা হয়েছে। এতে অবশ্যি তাদেরও দায় রয়েছে। মেধাবী, অসাধারণসহ আজগুবি সব বিশেষণ ব্যবহার না করলেই বিষয়টা পেচাতো না। সৌম্য সরকারকে যে গ্রাম বাঙলার ঐতিহাসিক দুধভাত কোটায় খেলানো হয় এটি এতদিনে পরিষ্কার হয়েছে। নির্বাচকরা সঠিক ব্যাখ্যাদানে ব্যর্থ হওয়ায় শেষমেষ নিজেই তিনি বিষয়টি পরিষ্কার করার মহৎ উদ্যোগটি নিয়েছেন। সাধু! সাধু!

শেষ কবে সৌম্যের তার সুনাম করার সুযোগ দিয়েছেন সেটি রীতিমত গবেষণার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। সদ্য সমাপ্ত উইন্ডিজ সফরের প্রথম ম্যাচটিই শুরু করেছেন গোল্ডেন ডাক মেরে! যে বলটিতে বিষম খেয়ে বোল্ড হয়েছেন সেটি ক্রিকেটের বেসিক জানেন এমন যে কাউকেই লজ্জায় ফেলবে। সৌম্যের সমস্যা তিনি ঠাউরে না পেলেও উইন্ডিয়ানদের লেগেছে মাত্র একটি ম্যাচ। শেষ দুটো ইনিংস দেখুন, দু’বারই স্লোয়ারে বিভ্রান্ত হয়ে ক্যাচ প্র্যাক্টিস করিয়েছেন ফিল্ডারদের! ওয়েস্ট ইন্ডিজের এ দলটি কতটা শক্তিশালী তা তো সিরিজ শেষেই পরিষ্কার, অথচ এই দলের একজন বোলার যখন এক ম্যাচেই বুঝে যাচ্ছেন সৌম্যের সমস্যাটি কোথায়, সেখানে মাসের পর মাস কাজ করেও তিনি ঠাউরে উঠতে পারছে না। সত্যিই নমস্য সৌম্য।

আপনি যদি ভাবেন যে, পেসের গতির তারতম্যেই শুধু তাল হারান তিনি তাহলে আপনিও বোকা বনেছেন। স্পিনের ঘূর্ণিতে মাথা ঘুড়ে বোল্ড হবার পরেও রিভিও নেয়ার অভূতপূর্ব দৃশ্যের জনম দিয়েছেন তিনি। সকলেই দেখে, শুধু দেখতে পায় না আমাদের নির্বাচকরা। এমনই প্রতিভাবান এই ব্যাটসম্যান, যে এখন বোঝাই দায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে তিনি আসলে কি হিসাবে দলে ঢুকেছেন! ব্যাট হাতে তিন ফরম্যাটেরই সর্বশেষ পাঁচটি করে মোট পনেরোটি ইনিংসের রান যোগ করুন, এক তামিম ইকবালের এক ইনিংসের রানের সমানই হবে না!

আমার এ লেখাটি কোন ক্ষোভ থেকে লেখা সেটি এবার পরিষ্কার করি বরং। আমি যেখানে থাকতাম, সেখানে একটি পুরি-সিঙ্গারার দোকান ছিল। বাবুল মিঞা ছিল দোকানদারের নাম। পাড় ক্রিকেটভক্ত বলতে যা বোঝায় বাবুল ভাই ছিলেন ঠিক তাই। ঘটনাটি ‘১১র বিশ্বকাপের। বাংলাদেশ-ইংল্যান্ড ম্যাচ ছিল সেদিন। সাধারনত খেলার দিন সকালে বাবুল ভাই দোকান খুলতেন না। সেদিন দেখি সকালেই হাজির। আমাকে দেখেই হেসে বললেন, বড়ভাই মনটা বলতেছে আজকে দল জিতবে। তাই আর ঘরে থাকতে পারলাম না। যদি জিতে আজকে দোকান সবার জন্য ফ্রি করে দিবো ভাই। ম্যাচটা বাংলাদেশ জিতেছিল, বাবুল ভাইও সবাইকে হাসি মুখে খাইয়েছিলেন। দিন এনে দিন খায় মানুষগুলো কতটা আবেগ নিয়ে দেশের খেলা দেখে ভাবুন তো একবার।

সে দলেই যখন একজন দিনের পর দিন খামখেয়ালি করেও টিকে থাকে তখন সেটাকে প্রহসন মনে হয়। সৌম্য কতটা প্রতিভাবন আমি জানি না, আমার কাছে তাকে অদৌ প্রতিভাবান মনেও হয় না। যে নিজেই জানে না তার সমস্যা কি সে কি করে প্রতিভাবান হয় সেটাই তো বুঝে আসে না। আমার কাছে সৌম্য হচ্ছে ছোট বেলার সে দুধভাত, যে শুধু মাঠেই থাকে কোনো কাজে আসে না। নির্বাচকদের নেক নজর যখন যোগ্যতার চেয়েও বড় হয়ে দাড়ায় তখন পথ হারাতে বেশিদিন লাগে না। আঠারো বছর পরেও যে আমরা এখনো খাবি খাচ্ছি তার অন্যতম প্রধান কারণ এই নির্বাচকদের চোখের এই অমিত প্রতিভাবানরা, যারা মহল্লার খেলায়ও দুধ ভাতের বেশি কিছু হবার যোগ্যতা রাখেন না।