হায় বাংলাদেশ ক্রিকেট! বধিরের হাতে জিম্মি সব

হায় বাংলাদেশ ক্রিকেট! বধিরের হাতে জিম্মি সব

অ্যান্টিগা টেস্টের প্রথম সেশন শেষেই বোঝা গিয়েছে টেস্টের ফল কি হতে পারে। একটা দল যখন প্রথম সেশন শেষ হবার আগেই গুটিয়ে যায় তখন টেস্টের ভবিষ্যত নিয়ে আর কোনো সংশয় থাকে না যদি না ব্যাটিংয়ে চূড়ান্ত ব্যর্থ দলটির বোলাররা অসাধারণ কিছু করে থাকে। যে দলের বিপক্ষে নিয়মিতই ৩৫০-৪০০ রান হয় তাদের বোলারদের কাছ থেকে সেরকম কিছু আশা করাটাও অন্যায়। বাস্তবতা বিবেচনায় ইনিংস এবং ২১৩ রানের হার হতাশাজনক হলেও অস্বাভাবিক কিছু না। আগে দুর্বলতাগুলো দেখা যাক, তারপরে খোঁজা যাবে পেছনের কারণ।

শুধুই দুর্বলতা

দক্ষিণ আফ্রিকার পর ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে প্রথম টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসের মাঝপথেই পরিষ্কার যে মান সম্পন্ন পেস অ্যাটাকের কোনো জওয়াব বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের জানা নেই। টেস্ট আঙ্গিনায় ১৭ বছর পার করা একটি দলের জন্য বিষয়টি বিস্ময়কর বৈকি। আবার বাংলাদেশ যে স্পিনেও আহামরি ভাল খেলছে বিষয়টি তেমনও না। হ্যাঁ, বলতে পারেন ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ার স্পিনারদের সামলে বাংলাদেশ টেস্ট জিতেছে। সেটির অন্যতম কারণ, সে দুই দলের স্পিনারদের মান এবং এমন কন্ডিশনে খেলার অনভিজ্ঞতা। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষেই স্পষ্ট দেখা গিয়েছে মান সম্পন্ন স্পিন অ্যাটাকের বিপক্ষে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের কি হালত হয়।

টেস্ট জিততে চাইলে প্রতিপক্ষ দলের বিশটি উইকেট নেয়াটা অপরিহার্য। আমাদের বোলাররা বিশটি তো দুর প্রতিপক্ষের দশটি উইকেট নিতেই হিমশিম খায়। স্পিনিং ট্র্যাক বানিয়ে ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়াকে হয়ত দেশের মাটিতে কাবু করা যায় কিন্তু বিদেশে গেলেই ধরা পড়ে বোলিংয়ের দৈন্য দশা। যে পিচে আমরা পঞ্চাশও করতে পারি না সে পিচেই ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৪০০ এর ওপরে রান তুলল। এখানে অল আউট করে আত্মশ্লাঘায় ভোগার সুযোগ নেই। বিস্ময়কর হচ্ছে ঘাসের পিচেও আমাদের অধিনায়ক পেসারদের চেয়ে স্পিনেই ভরসা রাখতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। এতেই বোঝা যায় আমাদের বোলিং এর অবস্থা।

টেস্টের মতো ম্যাচে, যেখানে হাফ চান্সকেও ফুল চান্সে পরিণত করা লাগে সেখানে আমাদের ফিল্ডাররা হাতের ক্যাচই ছেড়ে দিচ্ছেন অবলীলায়। হাফ চান্সের কথা বাদই দিলাম। এমন অবস্থায় বোলাররা যাও কিছু করে ফিল্ডারদের অসহোযোগিতায় সেটিও কাজে আসে না। সাথে রয়েছে চূড়ান্ত নেতিবাচক মানসিকতার ফিল্ড প্লেসিং। কেমার রোচের মত ব্যাটসম্যানের বিপক্ষে কেন ডিফেন্সিভ ফিল্ডিং সাজাতে হবে সেটার উত্তর অধিনায়কই ভালো দিতে পারবেন।

দায় নেবে কে?

সাদা চোখে পুরো দায়টা খেলোয়াড়দের ওপরেই পড়ে। কিন্তু বাস্তবিকই কি পুরো ব্যর্থতার জন্য খেলোয়াড়ারা দায়ী? আপনি যদি নিয়মিত বাংলাদেশের ক্রিকেট অনুসরণ করে থাকেন তাহলে এমনটা মনে হবার কারণ নেই।

ব্যাটসম্যানদের কথাই ধরা যাক প্রথমে। আমাদের দেশের ঘরোয়া লিগের খেলাগুলো হয় নিরেট ফ্ল্যাট উইকেটে অথবা মন্থর স্পিনিং উইকেটে। স্বভাবতই এমন পিচগুলোতে পেসারদের কিছুই করার থাকে না। যার ফলে পেস অ্যাটাক নিয়মিত খেলার অভ্যাসটাও ব্যাটসম্যানদের গড়ে ওঠে না। আবার এমন পিচে স্পিনারদের খেলেও যে ব্যাটসম্যানরা স্পিনের মাস্টার হয়ে উঠছে তাও না। আফগানিস্তানের বিপক্ষে সিরিজেই সেটি দেখা গিয়েছে। মান সম্পন্ন লেগ স্পিনার বা অফ স্পিনারদের সামনে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের খাবি খেতে দেখাটা ছিল হতাশাজনক। বাংলাদেশে স্পিনার রয়েছে ঠিকই কিন্তু বেশিরভাগই বাহাতি স্পিনার। এবং এদের টার্নও খুব একটা না। শেখার জায়গায়ই যখন এমন শূণ্যতা তখন মূল পরীক্ষার ফল যে ভালো হবে না সেটা তো অনুমিতই।

ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতার কারণেই পেসারদের ব্যর্থতার বয়ান অনেকটাই উঠে আসে। নিরেট ফ্ল্যাট অথবা স্পিনিং পিচ; ঘরোয়া ক্রিকেটে এই দু’ধরনের পিচেই হয় সব খেলা। এখানে পেসাররা সে অর্থে বলই তো করার সুযোগ পায় না। সুতরাং, ঘাসের উইকেট, যা দেখলে যে কোনো দলের পেসারদেরই চোখ চকচক করে ওঠে সেখানে আমাদের পেসাররা খাবি খায়। ঘরের মাঠে বাংলাদেশের শেষ কয়েকটি টেস্ট যদি লক্ষ্য করা হয়, দেখা যাবে বেশিরভাগ ম্যাচে একজন পেসারই খেলেছে। এবং সে একজন বোলিং করেছেও হাতেগোণা কয়েক ওভার। এখন কাউকে যদি ক্রমাগত উপেক্ষাই করা হয়, তাহলে তার প্রভাব পারফরমেন্সে পড়তে বাধ্য। আবার কোনো পেসার যদি ইনজুরি বা অফ ফর্মের কারণে দলের বাইরে চলে যায় তার পরিচর্যাও কতটা ঠিকভাবে হয় সেটাও প্রশ্নের দাবি রাখে। যেমন, শহীদ; টেস্টে বেশ ভালোই করছিলেন তিনি। কিন্তু ইনজুরির পর সেই যে হারালেন আর কোনো খোঁজ নেই।

বহুদিন ধরেই একটা কথা সবাই বলে আসছে যে, স্লিপে বাংলাদেশের নির্ভর করার মত কোনো ফিল্ডার নেই। ক্রিকেটে বিশেষ করে টেস্টে এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি পজিশন। এখানে বিশেষজ্ঞ ফিল্ডারের অভাবের কথা বহুদিন ধরেই বলে আসছেন বিশ্লেষক-বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু এ বিষয়ে কর্ণপাত করার যেন কেউ নেই। শুধু স্লিপেই না পুরো দলেই ক্যাচিং সমস্যা বিদ্যমান। কখনো স্লিপে তো কখনো কিপারের হাত ফসকে যাচ্ছে সহজ সব ক্যাচ। এমন অবস্থায় বোলাদের জন্যও কাজটা কারো কঠিন হয়ে যায়।

শুধু কথাই হয়, কাজ হয় না কিছুই

প্রায় প্রতি সিরিজ শেষেই ঘরোয়া ক্রিকেটে উন্নয়নের দিকগুলো সামনে নিয়ে আসেন বিশ্লেষকরা। বিসিবিও তখন পুতুলের মত মাথা নেড়ে সায় জানিয়ে বলে এবারই হবে, না হলে সামনের বার। এই এবারটা আর কখনোই আসে না, উন্নয়ন হয় না ঘরোয়া লিগের পিচের মানও।

আর অদ্ভুত বিষয়টি হচ্ছে জাতীয় দলে খেলোয়াড় বাছাইয়ের প্রক্রিয়া কি সেটাই স্পষ্ট না। ঘরোয়া ক্রিকেটের নিয়মিত পারফরমার দিনের পর দিন জাতীয় দলে উপেক্ষিতই থেকে যান। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, নির্বাচকরা নিজেরাই ভরসা পান নিজেদের ঘরোয়া লিগের মানের ওপর। সেক্ষত্রে যারা বর্তমানে খেলছেন তারাই বা কোন যোগ্যতায় বিবেচিত হয়েছেন সেটিও প্রশ্নের দাবি রাখে। তামিম-সাকিব-মুশফিক-মাহমুদুল্লাহ; এদের কেউ ফ্লপ করলেই ভেঙ্গে পড়ছে পুরো দল। নতুনদের মধ্য থেকে এখনো সেভাবে কেউই কেন উঠে আসছে না সেটিও ভাববার বিষয়।

প্রশ্ন তো অনেক; কথা হলো এর উত্তর দেবে কে? তার চেয়ে বড় প্রশ্ন আর কি লজ্জা অপেক্ষা করে রয়েছে সিরিজের পরবর্তী সময়টাতে। কষ্ট হচ্ছে যারা শুনবেন, যারা উত্তরগুলোর জওয়াব দিবেন তারাই যে বধির হয়ে বসে রয়েছেন।