এডওয়ার্ড সাইদের ‘ওরিয়েন্টালিজম’ প্রকাশের ৪০ বছর

হামিদ দাবাশি’র প্রবন্ধ

এডওয়ার্ড সাইদের ‘ওরিয়েন্টালিজম’ প্রকাশের ৪০ বছর

ইন্টারনেটে ১৫ বছর আগের একটি ভিডিও আছে যেখানে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে এডওয়ার্ড সাইদের বই নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে আমি সাইদকে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিলাম। তাকে অবশ্য পরিচয় দেওয়ার মত কিছুই নেই, এবং সেই সম্মেলনে তিনি ওরিয়েন্টালিজম বিষয়ে তার শেষ সময়ের বক্তব্য হাজির করেছিলেন।

আরেকটি ভিডিও আবার যেমন আছে, কয়েক মাস আগের, ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর। সেই ভিডিওতে জেনেভার একজন তরুণ আমার একটি ইন্টারভিউ করেছিল ওরিয়েন্টালিজম প্রসঙ্গে। এ দুটি ঘটনার মাঝে ২০০৯ সালে আমার বইটি বের হয়, ‘পোস্ট-ওরিয়েন্টালিজম : নলেজ এন্ড পাওয়ার ইন টাইম অফ টেরর’।

ফলে এই তিনটি সাল ২০০৩, ২০০৯ এবং ২০১৭ হচ্ছে চিন্তকদের একে অন্যের সাথে ভাব বিনিময়ের বিশেষ বছর। এবং এই সময়গুলো সাইদের এবং তার কাজের কাছে বেশ ঋণী কেননা উপনিবেশবাদ-পরবর্তী চিন্তাগুলোই সে সময়ে উঠে এসেছে। ওরিয়েন্টালিজমে সাইদ আমাদের চিন্তার জবান খুলে দিয়েছেন, উন্মুক্ত করে দিয়েছেন নতুন লড়াইয়ের তরবারি।

আরেকটি সময়ের কথা আমি বলতে চাই, তা হল, ২০০০ সালের অক্টোবর থেকে নভেম্বর, যখন কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির ইতালিয়ান একাডেমি ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজ সাবল্টার্ন স্টাডিজের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ইতিহাসবিদ রণজিৎ গুহকে বক্তৃতার জন্যে আমন্ত্রণ করেছিল। যেই বক্তৃতা পরবর্তীতে ‘হিস্ট্রি এট দ্য লিমিট অফ ওয়ার্ল্ড হিস্ট্রি’ নামে প্রকাশিত হয়।

এই সুযোগে আমি এবং আমার কলাম্বিয়ার সহকর্মী গায়ত্রী স্পিভাক রণজিৎ গুহকে নিয়ে ‘সাবল্টার্ন স্টাডিজ এট লার্জ’ নামে দুইদিনের একটি কনফারেন্স আয়োজন করি। সাইদ সে সম্মেলনের প্রথম দিনে এসে মূল বক্তব্য পেশ করেন।

পোস্ট-কলোনিয়াল এবং সাবল্টার্ন স্টাডিজের ক্ষেত্রে তাদের কাজগুলো বেশ বড় সংযোজন। যেখানে সাইদ, স্পিভাক এবং গুহ জ্ঞান উৎপাদনের প্রক্রিয়া নিয়ে বিশদ আলাপ করেছিলেন। এবং যেখানে জ্ঞান উৎপাদনের প্রক্রিয়া ইতিহাসের গণ্ডিতে বাধা এবং আমাদের ইউরোপ-কেন্দ্রিক দুনিয়া বুঝবার তরিকাকেও করেছে প্রভিন্সিয়ালাইজড।

ফলে এসব প্রভাবশালী চিন্তকদের আগে, ইউরোপের জ্ঞানের দুনিয়ার সবচেয়ে বড় ভোক্তা ছিল উপনিবেশিক আধুনিকতার দুনিয়ার মানুষেরা। তাই এসব চিন্তকেরা এই ইউরোপ-কেন্দ্রিক সমাজবিজ্ঞান এবং মানবিক বিভাগের জ্ঞানগত ভিত্তির উল্টোপথে হাটা শুরু করেছেন।

তাদের এই জ্ঞানগত ঐতিহাসিক চ্যালেঞ্জের পথে অনেক লেখাপত্রের সাথে আমরা পরিচিত হয়েছি। যেমন আছে স্পিভাকের ‘ক্যান সাবল্টার্ন স্পিক?’ কিন্তু কিছু কারণে এডওয়ার্ড সাইদের লেখা ওরিয়েন্টালিজম এসকল কিছুকে ছাপিয়ে গেছে।

ওরিয়েন্টালিজম বলি আমি, ঠিক সময়ের ঠিক বই, ঠিক লেখকের লেখা। অবশ্য সাহিত্যতত্ত্বের লোক সাইদ ওরিয়েন্টালিজম লেখার আগে বেশ কিছু বই-আর্টিকেল লিখেছিলেন।

কিন্তু ওরিয়েন্টালিজম ধাক্কাটা দিয়েছিলেন সময়মত। যখন আসলে সাম্রাজ্যবাদ-পরবর্তী দুনিয়ার জন্যে এর খুব দরকার। যখন পুঁজিবাদী আধুনিকতার ফ্রেম থেকে উপনিবেশিকতাকে ধরণগত এবং তাত্ত্বিক দিক থেকে তফাত করে দেখা দরকার হয়ে পড়েছিল। এই পুঁজিবাদী আধুনিকতার খপ্পরে থাকা উপনিবেশবাদ-পরবর্তী সময়ের এমন একটি বই দরকার ছিল, যেই বই এর চিন্তার এই ইমারত তৈরির জন্যেই সাইদের জন্ম।

অন্যসব দুনিয়া-পরিবর্তনকারী বই এর মতো, ওরিয়েন্টালিজম অনেক চিন্তাকে লড়াই করবার পাটাতন দিয়েছে। উদাহরণ দিতে চাইলে বলা যায়, এজাজ আহমেদ এবং জেমস ক্লিফর্ড। তবে আমার নিজের বই ‘পার্সোফিলিয়া : পার্সিয়ান কালচার অন দ্য গ্লোবাল সিন’; যেখানে আমি নিজেও সাইদের কিছু কিছু চিন্তা থেকে বেশ খানিকটা সরে এসেছি।

অনেক যুগান্তকারী চিন্তার মতোই, ওরিয়েন্টালিজমের চিন্তাকে কাজের মধ্য দিয়ে এগিয়ে নিয়েছেন অনেকে, যেমন আনওয়ার আব্দুল মালেক, তালাল আসাদ, বার্নার্ড এস কোহেন। এরাই মূলত সাইদের এই চিন্তাকে ধারণ করেছেন, তর্কে হাজির থেকেছেন।

এমনকি এই বইকে যারা নানা বিতর্কের মুখোমুখি করেছেন, ‘পশ্চিমের’ বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছেন, তারাও এই বইকে সময়ের প্রয়োজন হিসেবে গড়ে তুলতে অবদান রেখেছেন। ফিলিস্তিন প্রশ্নে সাইদের সাহসিকতা এবং লড়াইও পশ্চিমের কাছে এভাবে চিত্রায়িত করার ক্ষেত্রে নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। আসলে বইটি খুব উপযোগী বা কারো কাছে সম্মানহানিকর; এই দুইয়ের মাঝেই এই বই এর অতি আকাঙ্খিত ব্যাখ্যা আছে।

ওরিয়েন্টালিজম বইয়ের প্রচ্ছদ

এতসব হাউকাউয়ের মধ্যেও, ওরিয়েন্টালিজম উপনিবেশিকতা এবং উপনিবেশিক জ্ঞান উৎপাদনের বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনা হিসেবে টিকে থাকবে। ওরিয়েন্টালিজম মূলত জ্ঞান এবং শক্তির সম্পর্কের ব্যাপারে কথা বলে, যার সাথে খুব নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে ফুকো এবং নিৎশের চিন্তাভাবনা। এই চিন্তা জ্ঞানের সমাজতত্ত্বেরও ব্যাপক সমালোচনা করে যা আসলে মার্ক্স এবং এঙ্গেলসের জর্মন ভাবাদর্শের আলোচ্য বিষয়, এছাড়া আরো আছে ম্যাক্স শেলার, কার্ল ম্যানহেইম, জর্জ হার্বার্ট মিড। সাইদ হয়তো এসবের সাথে তার এই চিন্তার যুক্ততার বিষয়ে সচেতন ছিলেন না, সেজন্যে তার চিন্তা ছিল সাহিত্যতত্ত্ব কেন্দ্রিক, এবং তা ছিল একেবারে সাহিত্যে বয়ানের রিপ্রেজেন্টেশান।

সাইদের ওরিয়েন্টালিজমের শিক্ষা তার জ্ঞান এবং ক্ষমতার সম্পর্কের প্যাথলজিকে আমলে নেওয়ার মধ্যে বিরাজ করছে। এর বিস্তারিত আলাপ আমি আমার ‘পোস্ট-ওরিয়েন্টালিজম’ বইতে আলাপ করেছি, যেখানে এ ক্ষমতা-জ্ঞানের সম্পর্ক আসলে আরব বা মুসলিম বিশ্বের ক্ষেত্রে খাটে, বা সাধারণ দুনিয়ার ক্ষেত্রেও চলে।

 

ইউরোপীয় ওরিয়েন্টালিজমের ক্লাসিক জগত এখন চুপসে আমেরিকান এরিয়া স্টাডিজে পরিণত হয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে জন্ম নিয়েছে অনেক জায়নিস্ট থিংট্যাংক, যারা আমেরিকার লাভের জন্যে ইসরায়েলি উপনিবেশ করে কি কি লাভ হচ্ছে। এখন ইসলাম বা মুসলিমরা তাদের জ্ঞানের অংশ হতে পারেনি, হয়েছে কেবল নিতান্তই বস্তুগত এবং ঘৃণার ব্যাপার।

তার ফলেই মাইক পম্পে এবং জন বোল্টনের মত ইসলামোফোবিক লোক সেক্রেটারি অফ স্টেট এবং নিরাপত্তা উপদেষ্টা হতে পারেন। ফলে আমরা আমার সাইদের ওরিয়েন্টালিজম পর্বে যার কথা সাইদ বলেছেন।

আজ ইউরোপে ইহুদিদের প্রতি ঘৃণা বদলে আজ মুসলিমদের করছে। ক্লাসিকাল ওরিয়েন্টালিজমের প্রভাবে ইগনাজ গোল্ডজিহার জায়নিস্টদের পক্ষে জ্ঞান বিস্তারে রাজি হননি। অথচ যায়নবাদী প্রপাগাণ্ডা ছড়ানো বার্নার্ড লুইস এখন তাদের গুরু যিনি প্রতিনিয়ত ঘৃণা ছড়িয়ে যাচ্ছেন।

তাই সাইদের ওরিয়েন্টালিজমের আরো নিবিড় এবং ক্রিটিকাল পাঠ দরকার, যার ফলে আমরা উপনিবেশিক আধুনিকতা বাজারজাত করার যে ইউরোপীয় প্রজেক্ট চলছে তাকে থামাতে পারি। সাইদ আমাদের সে পথে হাটার দিক নির্দেশনা দিয়েছেন। তাই বলা যায়, কেবল শক্তিশালী চিন্তাই আগামী দিনের পথ দেখাতে পারবে না, সাথে দরকার ব্যাপক সাহস এবং কল্পনাশক্তি।