রাতটা রোনালদোর, রাতটা রিয়ালের

রাতটা রোনালদোর, রাতটা রিয়ালের

জুভেন্টাস ০-৩ রিয়াল মাদ্রিদ
ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ৩’, ৬৪’
‎মার্সেলো ৭২’

চ্যাম্পিয়ন্স লিগের হাই ভোল্টেজ কোয়ার্টার ফাইনালে অ্যালাইঞ্জ স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হয়েছিলো আসরের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন এবং রানার্স আপ; রিয়াল-জুভেন্টাস। রোনালদোর নজরকাড়া নৈপুণ্যের ওপর ভর করে তুরিন থেকে তিন গোলের জয় নিয়ে ফিরেছে রিয়াল। রোনালদোর জোড়ার পাশে অপর গোলটি মার্সেলোর।

প্রথমার্ধ

ঘড়ির কাটা পাঁচ মিনিট হবার আগেই তুরিনের বুড়িদের স্তব্ধ করে দিয়ে প্রথমার্ধ শুরু করে রিয়াল। ম্যাচের আগে বেল না ইস্কো, কাকে মূল একাদশে খেলাবেন জিদান তা নিয়েছে চলেছে বিস্তর জল্পনা-কল্পনা। ইস্কোতেই আশা দেখা জিদানের মুখের হাসিটা চওড়া করে হয়ে যায় ম্যাচের তৃতীয় মিনিটেই। ইস্কোর বাড়ানো চমৎকার এক বলে তার চেয়েও চমৎকার এক ফিনিশিং দিয়ে রোনালদো বুঝিয়ে দিয়েছেন ম্যাচের আগে কেন বারবার বুফন তার তারিফে মত্ত ছিলেন। চলতি মৌসুমে এখন পর্যন্ত খেলা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের প্রত্যেকটা ম্যাচেই গোল করলেন মাদ্রিদের মূল ভরসা এই তারকা। এবং চ্যাম্পিয়ন্স লিগে সবমিলিয়ে টানা দশম ম্যাচে গোল পেলেন রোনালদো, যা তার মুকুটে যোগ করেছে আরো একটি রেকর্ডের পালক।

শুরুতেই গোল খেয়ে কিছুটা খেই হারানো জুভেন্টাস নিজেদের সামলে নেয় দ্রুতই। পুরোটা সময় জুড়েই হয়েছে দারুণ ফুটবলের প্রদর্শনী। পাসিং, প্রেসিং, অ্যাটাক, কাউন্টার অ্যাটাক, অনুপম স্কিল কি ছিলো না এ হাফে? গোল হজম করে বসা জুভেন্টাস গোলের জন্য তাকিয়ে ছিলো আর্জেন্টাইন তারকা দিবালার দিকে। চমৎকার কিছু বলের জোগান দিয়ে সে আশায় অক্সিজেন সরবাহ করছিলেন তিনি, কিন্তু মৌসুমে প্রথমবার নিজেদের ফিরে পাওয়া রিয়ালের রক্ষণভাগের বাধায় নস্যাৎ হয়ে যায় তার সকল প্রচেষ্টা। দিবালার ফ্রি-কিকে হিগুইনেয় ভলি অসাধারণ দক্ষতায় রুখে দেন নাভাস। জুভেন্টাস যখন গোল শোধে মরিয়া তখনই দ্বিতীয় গোলটি প্রায় পেয়েই গিয়েছিলো রিয়াল। ক্রুসের দুরপাল্লার অসাধারণ শ্যুটটি বুফনকে ফাঁকি দিলেও বারের বাধায় আর জালে ঢুকতে পারেনি। গোলটি হলে নিঃসন্দেহে অসাধারণ একটি গোলই হতো। প্রথমার্ধটি শেষ হয় দিবালার হলুদ কার্ড দিয়ে। তার আগে লেখা হয়ে গিয়েছে কিছু আক্ষেপ, কিছু অসাধারণ মুহুর্তের গল্প। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের কোয়ার্টার ফাইনাল ঘিরে দর্শকদের যে প্রত্যাশা থাকে তার পুরোটাই পুরণ হয়েছে প্রথম পয়তাল্লিশ মিনিটে।

দ্বিতীয়ার্ধ

এক গোলের লিড এর স্বস্তি নিয়ে বিরতিতে যাওয়া রিয়াল গোল পেয়ে যেতে পারতো দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই, ম্যাচের ৫০ মিনিটে রোনালদোর লো শ্যুটটি বারের পাশ দিয়ে চলে না গেলে। এরপর থেকে আচমকাই যেন উধাও প্রথমার্ধের মুগ্ধকর ফুটবল। ৬৪ মিনিট পর্যন্ত যেন চলেছে ফাউলের উন্মুক্ত প্রদর্শনী, যার মাঝে একটি হলুদ কার্ড খেয়ে পরের ম্যাচে বাইরে থাকা নিশ্চিত করেছেন রামোস। ৬৪ মিনিটেই আসলো মোমেন্ট অফ দ্য ম্যাচ। কিয়েলিনির স্বভাব বিরুদ্ধ ভুলের সুযোগ নিয়ে ক্ষিপ্র রোনালদো বল বাড়িয়ে দেন লুকাসের দিকে। তার শ্যুটটি অসাধারণ দক্ষতায় রুখে দেন জুভেন্টাস ক্যাপ্টেন বুফন। সে বলটি নিজের দখলে নিয়ে ক্রস করেন কার্ভাহাল, তিনি নিজেও কি ক্রস থেকে ওমন অসাধারণ কিছু দেখার আশা করেছিলেন? মনে হয় না। ক্রসটি বাতাসে থাকা অবস্থাতেই রোনালদোর অবিশ্বাস্য ওভারহেড কিক, স্থানুর মতো দাঁড়িয়ে দেখা ছাড়া কিছুই করার ছিলো না বুফনের। গোলটি কতটা অসাধারণ ছিলো সেটি পরিষ্কারভাবে বোঝা যায় যখন দেখা যায় গোলটির পর রিয়ালের পাশাপাশি জুভেন্টাস সমর্থকরাও সমানতালে তালি বাজাচ্ছিলো। রোনালদোর সে গোলের মুগ্ধতার রেশ কাটার আগেই ম্যাচে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি খায় জুভেন্টাস। কার্ভাহালকে ফাউল করে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন অ্যালেগ্রিরর মূল ভরসা দিবালা। দারুণ ছন্দে থাকা মাদ্রিদ দিবালার না থাকার সুযোগটি পুরো কাজে লাগিয়ে আরো চেপে বসে জুভেন্টাসের ওপর। সেটির সুফলই তৃতীয় গোলটি, যা অনেকটাই নিশ্চিত করে দিয়েছে মাদ্রিদের সেমি-ফাইনাল। মার্সেলো-রোনালদোর চমৎকার ওয়ান-টু, এবং শেষ মুহুর্তে মার্সেলোর বুদ্ধিদীপ্ত চিপে বুফনকে বোকা বানানোর মধ্য দিয়ে আসে গোলটি। ৮৫ মিনিটে রোনালদো মিস করেছেন হ্যাট্রিকের সুযোগ। তার ঠিক তিন মিনিট পরেই আবারো রিয়ালকে বঞ্চিত করেছে বার, এবার শ্যুটটি নিয়েছিলেন কোভাচিচ। যোগ করা সময়ের একদম শেষ দিকে লুকাসের বাড়ানো বলটি অবিশ্বাস্যভাবে মিস না করলে হ্যাট্রিকের আনন্দ নিয়েই শেষ করতে পারতেন রোনালদো, তবে যেটকুই করেছেন তাতে রাতটা তার হয়েই থাকবে। দু দলের মধ্যে মূলত পার্থক্য গড়ে দিয়েছেন তিনিই। সাধারণ দর্শকদের জন্যও ম্যাচটি ছিলো দারুণ এক প্যাকেজ। রোনালদোর অবিশ্বাস্য সে গোল, দিবালার লাল-কার্ড; চ্যাম্পিয়ন্স লিগের কোয়ার্টারের পুরো প্যাকেজই ছিলো ম্যাচটি।

৩-০ গোলের জয়ের জন্যই শুধু না, বরং যেভাবে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত খেলেছে রিয়াল তাতে মৌসুমে প্রথমবারের মতো স্বস্তির শ্বাস ফেলতে পারেন জিদান। রক্ষণ-মধ্যমাঠ-আক্রমণভাগ প্রত্যেকটা ডিপার্টমেন্টেরই নৈপুণ্য ছিলো নজরকাড়া। বিপরীতে প্রথমার্থ সমানতালে লড়াই করলেও নিজেদের মাঠে তিনগোল হজম এবং দিবালার না থাকাটা জুভেন্টাসের সেমির আশা প্রায় সমাপ্তই করে দিয়েছে বলা যায়।

ম্যান অফ দ্য ম্যাচ : ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো