পাটপণ্যকে ঘিরে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারতীয় বাণিজ্যযুদ্ধ

পাটপণ্যকে ঘিরে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারতীয় বাণিজ্যযুদ্ধ

তৈরি পোশাকের বাইরে বাংলাদেশের রফতানি পণ্য সামান্যই। সেই তালিকায় বড় এক ভরসা হলো পাট। এতদিন বাংলাদেশের তৃতীয় সর্বোচ্চ রফতানি আয় আসতো পাট ও পাটজাত পণ্য থেকে। আর এক্ষেত্রে ভারত ছিল দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বাজার।
কিন্তু ভারত সরকারের বৈরি নীতির কারণে দেশটিতে বাংলাদেশি পাটপণ্যের রফতানিতে বিপর্যয় নেমে এসেছে বলা যায়। ভারতের পাটপণ্যের বাজারে বাংলাদেশের হিস্যা মাত্র ৮ শতাংশ হলেও ভারত সরকার গত বছর থেকে বাংলাদেশের পাটপণ্যের উপর ক্রমাগত একের পর এক এন্টি-ডাম্পিং শুল্ক বসাচ্ছে এবং তার প্রতিকার করতে ব্যর্থ বাংলাদেশ সরকার দেশটিতে কাঁচাপাট রফতানিও বন্ধ করে দেয়ায় মাঠ পর্যায়ে পাটের বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

প্রতি মেট্রিক টন পাটে ১৯ থেকে ৩৫২ ডলার পর্যন্ত এন্টি-ডাম্পিং শুল্ক বসানোর কারণে কেবল সর্বশেষ বছরে পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ভারতে বাংলাদেশের পাটপণ্যের বাজার পড়ে গেছে প্রায় ৬০ শতাংশ। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী গত ২৮ মার্চ দৈনিক সমকাল এক প্রতিবেদনে লিখেছে, গত আট মাসে ভারতে বিভিন্ন ধরনের পাটপণ্য রফতানি হয়েেছ ৫ কোটি ৮৭ লাখ ডলার। আগের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ১০ কোটি ৮৩ লাখ ডলার। এ সময় অন্য সব বাজারে পাট ও পাটপণ্যের রফতানি বেড়েছে ১৫ শতাংশের মতো।

অতিরিক্ত শুল্ক বসালে স্বাভাবিকভাবেই ভারতীয় বাজারে প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের পাটপণ্য ক্রমাগত সক্ষমতা হারাবে এবং কার্যত তাই হচ্ছে। ভারত সর্বশেষ গত মাসে বাংলাদেশের জুট স্যাকিং কাপড়ের ওপরেও এন্টি-ডাম্পিং শুল্কের আদলে অগ্রিম শুল্ক আরোপ করেছে।

দুই দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভাষায় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক যখন স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে ভালো যাচ্ছে বলা হচ্ছে তখনি বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ একটি পণ্যের ক্ষেত্রে ভারতের তরফ থেকে উপরোক্ত ঘটনা ঘটে চলেছে।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ প্রতিবেশী দেশে যেসব পাটপণ্য পাঠায় তার মধ্যে আছে পাটসুতা, বস্তা, চট ইত্যাদি। এর মধ্যে পাটসুতার বাজারই সর্বোচ্চ। কিন্তু গতবছর থেকে ভারত সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এন্টি-ডাম্পিং এন্ড এলাইড ডিউটিজ বিভাগের ডিজি দেশটির পাটপণ্য উৎপাদক ও ব্যাবসায়ীদের চাপে আগামী পাঁচ বছরের জন্য বাংলাদেশের প্রায় ২৫০টি কারখানার পাটপণ্যের ওপর বিভিন্ন হারে এন্টি-ডাম্পিং শুল্ক বসাতে শুরু করে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভারতের পাটপণ্যের বাজারে অসম এক প্রতিযোগিতায় পড়ে গেছে। ভারতের উৎপাদকদের সমিতি ‘জুটমিল এসোসিয়েশন’-এর অভিযোগ, বাংলাদেশ দাম কম রেখে ভারতে সেটা রফতানি করছে এবং ভারত সরকার তাদের বক্তব্যকেই শিরোধার্য করে বাংলাদেশের পণ্য রফতানিকে দুরূহ করে চলেছে। কৌতূহলোদ্দীপক দিক হলো, ভারত বাংলাদেশের পাটপণ্যে এন্টি-ডাম্পিং শুল্ক বসালেও কাঁচাপাটে শুল্ক কমিয়েছে ৪ শতাংশ। অর্থাৎ স্থানীয় উৎপাদকদের সেদেশের সরকার দুই ভাবে সুরক্ষা দিয়ে চলেছে এ খাতে।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে প্রতিনিয়ত দু’দেশের উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হলেও বাংলাদেশ ভারতের এই পদক্ষেপের বিপক্ষে কার্যকর কোন প্রতিবাদ করতে বা প্রতিকার আদায় করতে পারেনি। বরং কূটনীতিক পথে না যেয়ে বাংলাদেশ সরকার পরোক্ষ চাপ প্রয়োগের কৌশল হিসেবে গত জানুয়ারি থেকে ভারতে দুই ধরনের কাঁচাপাট রফতানি সাময়িক বন্ধ রেখেছে। বস্তুত এতেও লাভবান হচ্ছে ঐদেশের পাটচাষীরাই। অন্যদিকে বাংলাদেশের অনেক পাট সামগ্রী উৎপাদক– যারা ভারত ব্যতীত অন্যদেশে পণ্য রফতানি করেন– তারাও সরকারের পদক্ষেপে লাভবান হবেন অপেক্ষাকৃত কমমূল্যে কাঁচাপাট পাওয়ার মধ্য দিয়ে। কিন্তু ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য সমস্যার তাতে কোন সুরাহা হবে না বলেই অনুমান করা যায়।

বাণিজ্য বিষয়ে অভিজ্ঞদের মতে, যেহেতু এন্টি-ডাম্পিং একটা আইনগত পদক্ষেপ– সে কারণে একে ভারতে এবং ডব্লিউটিএতে আইনগত প্রক্রিয়ার মোকাবেলা করা কিংবা পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে বাংলাদেশে ভারতীয় পণ্যে এন্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপই সমস্যার একমাত্র মোকাবেলার পথ। কিন্তু ঢাকার সরকার সে পথে যাবে বলে এখনও তেমন কোন ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।

এদিকে ভারতে এন্টি-ডাম্পিং প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে আইনগত প্রক্রিয়া প্রতি কোম্পানির জন্য পৃথক পৃথক হওয়ায় বাংলাদেশ সরকারের সহায়তা ছাড়া ছোট ছোট রফতানিকারকদের জন্য ভারতে আইনী লড়াই চালানোও দুরূহ।

অন্যদিকে পাটপণ্যের রফতানি কমে যাওয়ার কারণে উভয় দেশের মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতিও বাংলাদেশের দিক থেকে আরও বেড়ে গেছে। কারণ ভারতে বাংলাদেশের রফতানিতে এতদিন পাট ও পাটপণ্যের হিস্যা ছিল প্রায় ৩০-৩৫ শতাংশ।