রামাদানের বিচার ঘিরে প্রহসন হচ্ছে কি

জামাল এলশায়াল’র লেখা

রামাদানের বিচার ঘিরে প্রহসন হচ্ছে কি

যে কোনাে বিচার ব্যবস্থার মূল কথাই হচ্ছে, দোষ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত সব ব্যক্তি নির্দোষ এবং সব বিদ্বেষমুক্ত সুষ্ঠু বিচার পাওয়ার অধিকার প্রত্যেকের আছে। ফরাসি বিচার ব্যবস্থা আজকের দুনিয়ার বেশ কয়েকটি বস্তুনিষ্ঠ বিচার ব্যবস্থার তালিকায় অন্যতম। কারণ ওই দেশের বিচার ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে তিনটি নীতির ওপর- স্বাধীনতা, ভাতৃত্ব ও সাম্য।

বাস্তবে আমরা ওই রকম অন্তত একটি মামলায় দেখতে পাচ্ছি না। সেটি হলাে, বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ ও মানবাধিকার কর্মী অধ্যাপক তারিক রামাদান-এর মামলার ক্ষেত্রে।

রামাদান মূলত সুইজারল্যান্ড-এর নাগরিক যিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন এবং সম্প্রতি তার বিরুদ্ধে দুই নারী কয়েক বছর আগে ঘটে যাওয়া আলাদা দুটি ধর্ষণের অভিযোগ তুলেছেন। কিন্তু রামাদানের আইনজীবী বলছেন, ওই ধরনের অভিযোগ কেবল মিথ্যাই নয়, বরং ফরাসি রাষ্ট্রপক্ষ রামাদান-কে অন্যায়ভাবে হেনস্তা করছে।

গত বৃহস্পতিবার রামাদানের জামিন আবেদন নাকচ করে আরো চার সপ্তাহ কারান্তরীণ থাকার আদেশ দেন এক বিচারক। অবশ্য তার বিরুদ্ধে আরোপিত অভিযোগের কিছুই প্রমাণ হয়নি, এখনো তদন্ত চলছে।

একই সময়ে তাকে রামাদানের পরিবারের সঙ্গে দেখা করার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। এর চেয়ে আশঙ্কার কথা হলো, কোনাে মেডিকাল চেকআপও করতে দেয়া হচ্ছে না। তার স্বাস্থ্য ভেঙে পড়েছে। কারা চিকিৎসকও ঠিক তা-ই বলেছেন।

গত বৃহস্পতিবারের শুনানিতে অংশ নিতে রাজি হননি রামাদান। তিনি দাবি করেছেন, ফরাসি সরকার নানান সময় তাকে নিশ্চুপ করে দিতে ব্যর্থ হওয়ায় তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক মামলা করেছে। রামাদানের আইনজীবীদের অনুরোধ, তার ওই মামলাটি যেন প্যারিস-এর বাইরে অন্য কোথাও সরিয়ে আনা হয়। না হলে তারা ওই আদালতের অধীন ন্যায়বিচার পাবেন না বলেই আশঙ্কা করছেন।

রামাদানের বিরুদ্ধে অভিযোগকারী ইসলাম বিদ্বেষী হেন্দা আয়ারি-র দাবি, ‘হ্যাশট্যাগ মি-টু’ ক্যাম্পেইনের প্রতি অনুপ্রাণিত হয়েই তারিক রামাদান-কে ধর্ষণকারী হিসেবে সবার মুখোমুখি করেছেন তিনি। দাবিকৃত ধর্ষণের ঘটনাটি ২০১২ সালের। এটিকে রামাদানের সমর্থকরা ফরাসি সরকারের কূটচাল বলে দাবি করছেন। তাদের মতে, ওই কারণেই বিচার শেষ হওয়ার আগেই শাস্তি পাচ্ছেন তারিক রামাদান।

ফ্রান্স এমন একটি দেশ যেখানে নিজের ইচ্ছামতাে পোশাক পরতেও মুসলিমদের বাধা দেয়া হচ্ছে। এমনকি ফ্যাসিস্ট ন্যাশনাল পার্টি যেখানে ক্ষমতাশীন এবং ‘নিগা’র মতাে বর্ণবাদী গালি ব্যবহার করনে মন্ত্রী-রাজনীতিকরা সেখানে প্রত্যেক সংখ্যালঘুই মনে করেন, ফ্রান্স আসলে একটি বর্ণবাদী রাষ্ট্র।

তারিক রামাদানের বিরুদ্ধে আরেক অভিযোগকারী ক্রিস্টেলা। তার দাবি, তাকে ২০০৯ সালের ৯ অক্টোবর বিকালে লিয়ন-এর এক হোটেল রুমে ধর্ষণ করেন রামাদান। এর পরিপ্রেক্ষিতে রামাদানের আইনজীবীরা প্রমাণ পেশ করেছেন, ঠিক ওই সময়ে রামাদান ৩০ হাজার ফিট উপরে বিমানে সফররত ছিলেন। তার বিমান ল্যান্ড করে ৬টা ৩৫ মিনিটের দিকে। তিনি সেখানে ফ্রান্সের শত শত নাগরিকের সামনে ইসলামে সহঅবস্থান, সম্মিলন ও তরুণ মুসলিমদের দায়িত্ব বিষয়ে বক্তব্য রাখেন। ফলে ওই ঘটনাই তো তার বিরুদ্ধে অভিযোগকে খণ্ডন করে দিতে যথেষ্ট। তবে শুধু ফ্রান্সে নয়, পুলিশের তদন্ত কর্মকর্তা এই তথ্য গ্রহণ করলেও তারা জানান, ওই তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে পুলিশ ব্যর্থ হয়েছে। এরপর সব কিছু অবাক করে দিয়ে ওই তথ্য ফাইল থেকে গায়েব হয়ে যায়। এও জানা গেছে, ক্রিস্টেলা ২০০৯ সালেই ম্যাজিস্ট্রেট মাইকেল দেবাক ও ইসলাম বিদ্বেষী ক্যারোলিন ফৌরেস্ট-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

রামাদানের আইনজীবীদের দাবি, তিনজনের ওই সাক্ষাৎ থেকেই এ ষড়যন্ত্রের পরিকল্পনা হয়। দেবাক যিনি এখন রামাদানের আদালতেই নিযুক্ত আছেন। অথচ ক্রিস্টেলার সঙ্গে তার ‘আগে যোগাযোগ’-এর কথা আদালতে খোলাসা করেননি। এটি ওওই দেশের আইন মতে অবৈধ। ক্রিস্টেলার ওই গোঁজামিল আরো পরিষ্কর হয় যখন দাবি করেন, তার সঙ্গে রামাদানের ওই মেসেজ আলাপগুলোসহ ফোনটি নাকি হারিয়ে গেছে। তার ওই ফোন হারিয়ে যাওয়াটা অবশ্য তার জন্যই ভালাে। কেননা তার সহ-অভিযোগকারী আয়ারির ফোন থেকে রামাদানের আইনজীবীরা ২৮০টির বেশি মেসেজ উদ্ধার করেছেন যেখানে দেখা গেছে, স্বয়ং আয়ারি রামাদান-কে হেনস্থা করছিলেন।

একটি ফরাসি পাবলিকেশনের সঙ্গে আলাপে আয়ারি সেটি স্বীকার করেছেন, সাবেক সালাফি এখন ইসলাম বিরোধী আয়ারি আসলে রামাদানকে প্রলুব্ধ করে ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করেছেন। আয়ারির নানান অবৈধ কথা বাদ দিলেও রামাদানকে পাঠানো আয়ারির ওই মেসেজগুলো ছিল ২০১৪ সালের। তা আয়ারির ধর্ষিত হওয়ার দুই বছর পর- কী অদ্ভুত!

রামাদান দু’তিন দশক ধরে কথা বলে যাচ্ছেন। তার বই ও বক্তব্য- সবই আমাদের সংস্কৃতি, লিঙ্গ, স্বাধীনতাভেদে একে অপরের প্রতি সম্মান দেখানো কেন্দ্র করেই প্রদান হতাে। ফলে লাখো মানুষের জন্য নানান যুক্তির বিচ্ছুরণ ঘটান। ফলে নির্যাতিত মুসলিমরা তাদের ক্ষোভ কাজে লাগিয়ে নিজেকে আরো উন্নত করতে পারেন।

রামাদানের কোনাে ভিক্টিম কার্ড ব্যবহার করার পক্ষে কখনো ছিলেন না। ইউরোপীয় মুসলিমরা ওই দুনিয়ায় সবচেয়ে নিগ্রহ ও ভুল রিপ্রেজেন্টেশনের স্বীকার সংখ্যালঘু। এ কারণেই হয়তাে তিনি স্বেচ্ছায় ফ্রান্সে এসেছেন এবং তদন্তকারীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। নির্দোষের কোনাে ভয় থাকে না। কিন্তু তাকে সহযোগিতা করার বদলে জেলে পুরে দেয়া হলাে। অথচ তিনি এখনো প্রমাণিত দোষী নন।

রামাদান ৫০ হাজার ইউরো জামানত, প্রতিদিন হাজিরার সঙ্গে তার পাসপোর্ট জমা দিতে রাজি হন যাতে তার যে দেশের বাইরে যাওয়ার ইচ্ছা নেই সেটির যেন নিশ্চয়তা থাকে। এতকিছুও নাকি কোনো সম্মানিত অধ্যাপককে বিশ্বাস করার জন্য যথেষ্ট নয়। অথচ তার বিরুদ্ধে কোনাে পুরনো অপরাধও রেকর্ড নেই।

আমরা যখন ফরাসি গণমাধ্যমগুলোর একের পর এক ইসলাম বিদ্বেষী প্রচারণায় অভ্যস্ত, এর উপর রামাদানের ওই মামলায় রয়েছে নানান খুঁত এবং একই সঙ্গে আদালতের নানান গোলযোগ বলে দেয়, ওই বক্তব্যটি কতটা হাস্যকর যে, রামাদান কেবল বিলম্বিত রায়ের কারণে জেলে আছেন।

কয়েক মাস ধরে ফ্রান্স সরকারের সিনিয়র দুই মন্ত্রী জেরাল্ড ডারমানিন ও নিকোলাস হুলোট-এর বিরুদ্ধে একই রকম দুই নারীকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। অথচ ফরাসি মিডিয়ায় তাদের সাক্ষাৎকার প্রচার করেও নিজেদের সাফাই গাওয়ার সুযোগ দিয়েছে। আরো চোখে লাগার মতাে দ্বিচারিতা হলাে, অভিযুক্ত কোনাে মন্ত্রীকেই জেলে নেয়া হয়নি। ফলে কেউ কেউ মনে করেন, কেবল ইসরায়েল-এর দখলকৃত অঞ্চল ফিলিস্তিন-এর পক্ষে কথা বলায় ইসরায়েল লবি রামাদানের ওপর নাখোশ সব সময়ই ফ্রান্স। আবার অনেকে মনে করেন, তিনি অভিবাসীদের পক্ষে কথা বলেন এবং ইসলাম বিরোধী স্টেরিও টাইপিংয়ের ব্যাপারেও ছিলেন কঠোর। এর ওপর ভিত্তি করে ফরাসি রাজনীতির এলিটরা মুসলিমদের শত্রুজ্ঞান করে।

আলজাজিরা-র সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট জামাল এলশায়াল-এর লেখাটি তুরস্কের ‘ডেইলি সাবাহ’ পত্রিকায় গত ১ মার্চ প্রকাশ করা হয়