শস্তা শ্রম, প্রাকৃতিক সম্পদ, সহজ শর্তে চুক্তিসহ নানান কারণে এশিয়ার দেশগুলো ‘সাধারণ বাজার’ থেকে ‘উদীয়মান বাজার’ হয়ে উঠছে। সম্প্রতি চীন ও জাপানের মিয়ানমার কেন্দ্র করে নতুন নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সৃষ্টি হয়েছে বিভিন্ন মেয়াদে। চীন-জাপানের ওই ‘নতুন খেলা’য় লড়াইয়ের চেয়ে পাল্টাপাল্টি নানান উন্নয়ন চুক্তি বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
দীর্ঘ দুই দশক ধরে পশ্চিমি ব্যবসায়ীদের এক ধরনের অবরোধের মধ্যে ছিল মিয়ানমার। অবশ্য ২০১১ সালে বেসামরিক সরকার ক্ষমতায় গেলে ওই অবরোধে কিছুটা ঢিল আসে। মূলত শস্তা শ্রম, প্রচুর কৃষি সম্পদ, নতুন নতুন বন্দরের জন্য উপযুক্ত জায়গার সহজ লভ্যতা এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় দেশটির কৌশলগত অবস্থানের কারণে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সবদিক থেকে বেড়েছে।
মিয়ানমারে চীনের বিনিয়োগ
চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ প্রকল্পের অধীনে চীন সরকার ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার অর্থ বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং খোদ মিয়ানমারে এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ব্যবসায়ী-বন্ধু চীন। ১৯৮৮ সাল থেকে মিয়ানমারে ১৪ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে যা মিয়ানমারের মোট বিদেশি বিনিয়োগের তিন ভাগের এক ভাগ। এমনকি গত বছরের প্রথম আট মাসেই চীন-মিয়ানমারের দ্বিপক্ষীয় ব্যবসার মূল্যমান ৭ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলার যা বছর শেষে এসে হয়েছে প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলার।
এভাবেই মিয়ানমারের নানান উল্লেখজনক প্রকল্পের পাশে ছিল চীন। মিয়ানমারে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর এবং একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল করার জন্য গত বছর চুক্তিবদ্ধ হয়েছে চীনের সিটিক গ্রুপ, চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি ও চায়না মার্চেন্টস হোল্ডিং। এর আগে মিয়ানমারে চীনের বিনিয়োগে তৈরি কিয়াউক পিউ বন্দর থেকে চীনের কুনমিং সংযোগকারী ১০ বিলিয়ন ডলারের পাইপলাইনের কাজ ততদিনে শুরু হয়েছে। ওই পাইপলাইন কৌশলগতভাবে সিঙ্গাপুরকে এড়িয়ে সোজা মালাক্কার দিকে চলে গেছে। এর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য থেকে চীনের জ্বালানি সংগ্রহের একটি বিরাট সুযোগ তৈরি হয় যা ‘ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড’ প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
মিয়ানমারে জাপান
চীনের ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ প্রকল্পকে একটি সূক্ষ্ম খোঁচা দেয়ার জন্য জাপান নতুন কূটনৈতিক স্লোগান ‘গুণগত অবকাঠামোর জন্য বন্ধুত্ব’ হাজির করে। যদিও শি জিন পিংয়ের প্রকল্পই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে তবুও জাপান কয়েক দশক ধরে অবকাঠামোগত প্রকল্পে নানানভাবে কাজ করছে, বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। এডিবি, জাইকা ও জাপান ইনফ্রাস্টাকচার ইনিশিয়েটিভসহ নানান অবকাঠামোগত উন্নয়ন সংস্থার মাধ্যমে শিনজো আবে এশিয়ার বিনিয়োগ তল্লাটে সব সময় হাজির ছিলেন। কিছুদিন আগে তাদেরওেই বহির্দেশ উন্নয়ন প্রকল্পে আরো ২০০ বিলিয়ন ডলার যুক্ত হয়েছে। আবে-র বেশকিছু বিশাল প্রকল্পের মধ্যে ছিল তুর্কমেনিস্তান-এ ৮ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলারের গ্যাস পরিশুদ্ধ কেন্দ্র ও ৪ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলারের রাসায়নিক প্লান্ট স্থাপন। এছাড়া আছে উজবেকিস্তান-এ একটি বিরাট সার কারখানা চালু। এছাড়া ভারতের দিল্লি-মুম্বাই বরাবর শিল্প করিডোর, দক্ষিণ আন্দামান দ্বীপে ডিজেল প্লান্ট প্রতিস্থাপন এবং মুম্বাই থেকে আহমেদাবাদ-এর মধ্যে দ্রুতগতির রেল যোগাযোগসহ আরো দুটি মেট্রোরেল যোগাযোগ স্থাপনে চুক্তিবদ্ধ হওয়া।
বিশেষ করে মিয়ানমারে জাপান বেশ সময় ধরে এক ধরনের দীর্ঘ মেয়াদি সম্পর্ক টিকিয়ে রেখেছে, এমনকি জান্তা সরকারের সময়ও। এরপর যখন বিনিয়োগের জন্য মিয়ানমার নিজেকে মেলে দিতে শুরু করলাে তখন জাপান সময় নষ্ট না করে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং লক্ষণীয় কম সময়ের মধ্যে মিয়ানমার সরকারকে তিন বিলিয়ন ডলার নগদ ঋণ সহায়তা দেয়। এর সঙ্গে রেল যোগাযোগ, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা উন্নয়ন ও জ্বালানি খাতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে বিশেষ প্রকল্প হাতে নেয়।
জাপান ২০১২ সাল থেকে মিয়ানমারে প্রায় ৭১৭ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। এর মধ্যে আছে থিলাওয়া বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা ও ইয়াঙ্গুনের বাইরে প্রায় ২ হাজার ৩৪২ হেক্টর জমিকে শিল্প অঞ্চল হিসেবে প্রস্তুত করা। ওই শিল্প অঞ্চল প্রস্তুতকরণ প্রকল্পের ৪৯ শতাংশই জাইকা ও জাপানিজ ব্যাংক থেকে অর্থায়ন করা হয়েছে। এটিই প্রথম কোনাে জাপান-মিয়ানমার দ্বিপক্ষীয় চুক্তি যাতে জাপানের সরকারি-বেসরকারি যৌথ বিনিয়োগ কাজ করেছে। তাছাড়া এখন পর্যন্ত ২১টির বেশি কোম্পানি আছে যেগুলো জাপানের হয়ে সেখানে অর্থলগ্নি করতে প্রস্তুত আছে।
মিয়ানমারের জ্বালানি খাতের ব্যাপারে জাপান খুব আগ্রহী। ‘জাপান ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডিসিশনস’ নামে একটি ফার্ম সেখানে সিঙ্গাপুর ও মিয়ানমারের দুটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে ১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের পালুজাওয়া কয়লার খনি প্রক্রিয়াজাত এবং একটি সংযুক্ত বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের কাজে নেমেছে। এছাড়া রয়েছে সাড়ে তিন বিলিয়ন ডলারের কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব।
ওই রকম বড় বড় বিনিয়োগের বাইরে জাপানের অনেক প্রতিষ্ঠান মিয়ানমারের নানান উন্নয়ন পরিকল্পনায় কাজ করছে। যেমন আছে- জেএফই স্টিল কর্পরেশন ও হানওয়া। এছাড়া মিতসুবিশি ও জেলাক্স-এর যৌথ কার্যক্রমে মিয়ানমারের ম্যানডালায়-এর বিমান বন্দর সংস্কার এবং পরিচালনার কাজ চলছে। জাপান এক্সচেঞ্জ গ্রুপ নামে একটি কোম্পানি ইয়াঙ্গুন শেয়ার মার্কেটে নিজেদের বিনিয়োগ লগ্নি করছে। মিতসুবিশি আসলে একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান যার অধীন ইয়াঙ্গুন-এ প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন ডলারের প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে এবং জাপানের তিনটি বড় ব্যাংক প্রতিটি সেখানে ৭৫ মিলিয়ন ডলার করে বিনিয়োগ করেছে। এক হিসাব মতে, ঋণ সহায়তা হিসেবে ২০১৫ সালে মিয়ানমার-কে প্রায় এক বিলিয়ন ডলার প্রদান করেছে জাপান। ওই সহায়তার সঙ্গে বাড়তি ২০১৬ সালে ৭৭ বিলিয়ন ডলার সাহায্যের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। ২০১৭ সালে তা বেড়ে ৮২৪ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। উল্লেখ্য, ইয়াঙ্গুন আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের অর্ধেক অর্থায়ন জাপানের। এর সঙ্গে সংযুক্ত ছিল প্রায় ৭৫০ মিলিয়ন ডলারের একটি ঋণ চুক্তি।
কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক লড়াই
এশিয়া কেন্দ্র করে চীন ও জাপান কূটনৈতিক এবং অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার মধ্যে রয়েছে। গত বছরের মে মাসের দিকে শি জিন পিংয়ের আলোচিত ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড প্রকল্পের পর পরই ভারত ও জাপান সম্মিলিতভাবে পাল্টা নিজেদের লক্ষ্য ঘোষণা করে ‘এশিয়া-আফ্রিকা উন্নয়ন করিডোর’ নামে। এর পরিপ্রেক্ষিতেই বাংলাদেশেও চীনের বদলে জাপান গভীর সমুদ্র বন্দর করার সুযোগ পায়। এছাড়া শ্রীলংকায় চীনের সাম্প্রতিক হাম্বান্তোতা গভীর সমুদ্র বন্দরের কাজ হাতে নেয়া এবং পরবর্তীকালে একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল করার পরিপ্রেক্ষিতে জাপান ও ভারত যৌথ কার্যক্রমে একটি শিল্পাঞ্চল এলাকা এবং ট্রিঙ্কোমালে-তে একটি বন্দর করার কথা ভাবছে।
ওই প্রতিযোগিতা থাকলেও সম্মিলিতভাবে নানান উন্নয়ন প্রকল্পে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে। যেহেতু ওই প্রতিযোগিতা কেবল তাদের জাতীয় স্বার্থে পরিচালিত হচ্ছে এবং এডিবি বলছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ নানান কারণে এশিয়া অঞ্চলের অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য বছরে ১ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার লাগবে ও এই চাহিদা বেড়ে ২৬ ট্রিলিয়ন হবে ২০৩০ সালে সেহেতু ওই বিনিয়োগ কেন্দ্র করে এশিয়ায় রাজনীতির ‘খেলা’য় নতুন নতুন মোড় আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
- যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী ব্যবসা বিষয়ক ম্যাগাজিন ফোর্বস’-এর অনলাইনে প্রকাশিত সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অবলম্বনে তৈরি