সাম্প্রতিক সময়ের বেশ আলোচিত সমালোচিত এক সিনেমা ‘পদ্মাবত’। তাই দেখার আগ্রহ ছিলো প্রবল, দেখার আগেও কয়েকটা রিভিও পড়েছিলাম এবং দেখার পরে আরো বিস্তারিত ইতিহাস পড়তে হলো। এইবার মূল কথায় আসি।
ইতিহাসের ব্যাখার মূল সমস্যা হলো এইটা সবসময় একশো ভাগ সলিড বলে চালানো মুশকিল আর সেই ইতিহাস যদি সাত আটশো বছর অাগের হয়, তাহলে তো কথাই নেই। আসলে ইতিহাস ব্যাপারটাই এমন, যে বর্ণনা দেয় সে তার সুবিধামতোন বর্ণনা করে।
এ প্রসঙ্গ আনার কোন কারণ থাকতো না যদি একটা সিনেমাকে কেবলই বিনোদন হিসেবে চালানো যেতো, কিন্তু দেশটা যখন ভারত আর রাজনীতির আবহাওয়া যখন হিন্দুত্ববাদিতায় সয়লাব এবং বানসালির মতো ঝানু লোক যখন পরিচালক তখন আর সে সুযোগ থাকে না।
সিনেমাটির সবচাইতে ইন্টারেস্টিং চরিত্র খিলজী নিয়ে আমি বেশি কিছু বলতে চাই না। কারণ আপনারা ইতিমধ্যে তার ইতিহাস কম বেশি জেনে ফেলেছেন। রণবীর তার সবটুকু দিয়ে অভিনয় করেছেন। এখানে ফ্যাক্ট হলো খিলজীর উপস্থাপনটা, বানসালি কতটুকু নিরপেক্ষতা বজায় রেখে করেছেন? তাহলে দেখা যাবে একজন স্বনামধন্য পরিচালক হয়েও তিনি বিগত এক দেড় দশকের বলিউডে যে বর্ণবাদ চলে আসছে মুসলিম এর বিপক্ষে সেইটা থেকে বের হয়ে আসতে পারেননি। তৎকালীন ইতিহাস যদি আমরা দেখি, সেইসময় জোর যার মুল্লুক তার এই নীতি প্রচলিত ছিলো। ক্ষমতা বৃদ্ধি, যৌনদাসী, হেরেমে নারী ও মদ মোটামুটি প্রায় সব রাজা জমিদার এইসব নোংরামিতে অভ্যস্ত ছিলেন। তো সে হিসেবে খিলজীর পক্ষে সাফাই গাওয়ার আমার কোন ইচ্ছে নেই, কিন্তু বানসালি একাধারে তার চরিত্রকে যেভাবে এস্যাসিন করেছেন তার বিপরীতে রতন সিংকে বানিয়েছেন মহামানব এইখানে উনার কাজ প্রশ্নবিদ্ধ হয়। সিনেমার খিলজীরে দেখার পর সবার আত্মা কেঁপে উঠবে আবার রতন সিংকে দেখে বিনয়ে গলে যাবে। একপেশে ও উদ্দেশ্যমূলক চিত্রায়ন যেভাবে করা হয়েছে তাতে একে ভন্ডামি বলাই যায়।
একজন গুণী পরিচালকের সাথে যেটা যায় না। প্রসঙ্গক্রমে এইখানে বলে রাখি: ভারতে বিগত এক দেড় দশকের নির্মিত চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে ৭২ শতাংশ জুড়ে মুসলিমদের নেতিবাচক ভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং অধিকাংশ জায়গায় জঙ্গি হিসেবে উপস্থাপন করেছে (সূত্র: ভারতীয় ম্যাগাজিন দ্য কুইন্ট) যেটা স্পষ্টই তাদের মানসিকতা বুঝতে সাহায্য করে। তাছাড়া ভারতের নিকট অতীত এবং সাম্প্রতিক সময়ের থ্রিলার অ্যাকশন সিনেমার প্লটগুলো দেখেন প্রায় সব সন্ত্রাসবাদ নির্ভর প্লট।
দুঃখের বিষয় বানসালির মতো পরিচালকও সেই যায়গায় নিজেকে দৃঢ় রাখতে পারেন নি।পরিচালক হিসেবে এটা তার ব্যর্থতা।এইখানে যদি উনি ফিফটি ফিফটি থাকতেন তাহলে এইটা নিয়ে এতো কথা উঠতো না। চলচ্চিত্র যেখানে ভারতের অস্থিতিশীল সমাজে একটা পরিবর্তন আনার কথা সেখানে এইসব রোল আরো বিভাজন তৈরি করছে এবং সংখ্যালঘু মুসলিমদের জীবন আরো সংকটাপন্ন করে তুলছে। প্রশ্ন আসে, বলিউড কি তবে ভারতীয় হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক শক্তির এজেন্ডা বাস্তবায়ন এ কাজ করছে?
সম্প্রতি ইসরায়েল বলিউডে অর্থলগ্নির ঘোষণা দিয়েছে। এ মাসেই ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ভারত সফরের এক পর্যায়ে বলিউডেও হাজির হন। নেতানিয়াহু বলিউডের প্রযোজক পরিচালকদেরকে ইসরায়েলে সিনেমার শূটিং করতে আমন্ত্রণ জানান। এবং অলরেডি ইসরায়েলে বলিউডের একটি মুভির শ্যুটিং শুরুও হয়েছে। চলচ্চিত্রের রাজনীতি বুঝতে হলে এইসব বিষয় মাথায় রাখতে হবে।
এইবার অন্য প্রসঙ্গে আসি, এই মুভির সবচাইতে ইউনিক একটি রিভিও লিখেছে স্বরা ভাষ্কর। তার মূল পয়েন্ট ছিলো বানসালি রানী পদ্মাবতীসহ বাকি মহিলাদের আগুনে আত্মাহুতি দেওয়ার দৃশ্যের মাধ্যমে মূলত নারী সমাজের অপমান করেছেন। তার বক্তব্য অনুসারে এই দৃশ্য বর্তমান ধর্ষিত নারীদের প্রতি অবমাননার শামিল এবং যারা ধর্ষণসহ নানা নির্যাতনের পরেও সংগ্রাম করে টিকে আছেন তাদের প্রতি অবমাননাকর। তার বক্তব্য নারী সম্ভ্রম রক্ষাকেই সিনেমাটিতে নারী জীবনের মূল লক্ষ্য হিসেবে দেখানো হয়েছে। তার বেঁচে থাকার লড়াইটাকে গৌণ করে। ভারতীয় আদালতও নাকি এইসব দৃশ্য ড্রামালাইজেশন করার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা আছে সেটাও মানেন নি। উনি আরো বলেন মুভির শুরুতে এইসব ফিকশন বললেও বর্তমান সামাজিক বাস্তবতার উপর এর যে ভয়ঙ্কর প্রভাব পড়বে সেটা অস্বীকার করার উপায় নাই। তার এ বক্তব্যের সাথে আমি সহমত পোষণ করছি। স্বামী ছাড়া নারী রাজপুত নারীর জীবন ঠুনকো রাজপুতদের এই মানসিকতাকে বড় করে দেখানোর কিছু নেই।
বানসালির সব মুভি আমি দেখেছি সেই অভিজ্ঞতা থেকে এবং এই মুভি দেখার অভিজ্ঞতা থেকে একটা জিনিস বলা যায় তিনি যত বিশাল আয়োজন করেন গল্প বলার জন্য সেই তুলনায় গল্পের তেমন গভীরতা থাকে না। এইটাতেও আয়োজন আছে ডায়লগ ও মোটামুটি ভালো তবে গল্প তেমন জমেনি। যুদ্ধ দৃশ্যগুলোও তেমন গভীর কিছু হয় নাই। তবে ডিরেকশন, সিনেমাটোগ্রাফি এবং অভিনেয়শিল্পীদের থেকে শতভাগ টুকুন বের করে আনার মুন্সিয়ানা তার রয়েছে সেটা বলতেই হয়।