ইন্দোনেশিয়ার ‘নেকাব স্কোয়াড’

ইন্দোনেশিয়ার ‘নেকাব স্কোয়াড’

একদল কালো-রূঢ় নেকাব পরিহিতা বালিকাসুলভ চাপা হাসি হাসে যখন তারা আমার চারপাশ দিয়ে যায়, আমার মাথা থেকে পা পর্যন্ত ঢাকা পোশাক ঠিক করা দেখতে পায়।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটি কালো, কিন্তু একটি কালো ফোটাওয়ালা সবুজ পাড় প্রানবন্ত পোশাক ডিজাইনার ইন্দদরী মিন্দ্রায়ন্তীর ট্রেডমার্ক, যিনি মনে করেন এই ফোটাওয়ালা নকশা অন্যের সাথে আনন্দ ভাগ করে নেয়ার প্রতীক।

“আমার সব পোশাকে পলকা-ডটের বিশেষত্ব রয়েছে” ইন্দদরী বলেন। যদিও খুব বেশি ফোটা থাকে না কেননা তাতে পোশাক মনোযোগ আকর্ষন করে না।

যখন নেকাবের বেলায় আসে, চোখ ছাড়া মুখের বাকি সমস্ত অংশ ঢাকা থাকে। এর বিভিন্ন প্রকারভেদও রয়েছে- প্রজাপতি নেকাব, অর্ধ নেকাব, মিশরীয় স্টাইল, ইয়েমেনি স্টাইল, এমনকি বিয়ের নেকাব। এটা কালোই হতে হবে এমন কোন তথা নেই। এটি যেকোন রঙের হতে পারে যতক্ষণ না তা আকর্ষনীয় নয়।” ইন্দদরী বলেন। এবং এই মুকুটের মহিমা এই যে এটি বলে, “আমি নেকাব পরি কিন্তু আমি সন্ত্রাসী নই।”

দ্য নিকাব চ্যালেঞ্জ

আমি ‘নেকাব চ্যালেঞ্জ’ নামক একটা কিছুতে অংশগ্রহণ করেছিলাম যেখানে এই পোশাকটি বিকৃত করে ডিজাইন করা হতো অন্যদের পরার জন্য উৎসাহিত করতে। এটি ‘নেকাব স্কোয়াড’ ধারা পরিচালিত হতো যা ইন্দদরী ইন্দোনেশিয়ায় প্রতিষ্ঠা করেন।

‘নেকাব চ্যালেঞ্জ’ সাধারণত পাবলিক ইভেন্ট। ফেসবুকে একটি ভিডিও প্রকাশ করা যা অংশগ্রহণকারীদের জন্য কতটা অনুভূতি প্রবণ তা প্রকাশ করে। কিন্তু আমি ইন্দদরী’র রুমা পলকা ডট ( পলকা ডট হাউস)-এ করার আমন্ত্রণ পাই। যা জাকার্তার খানিকটা বাইরে অবস্থিত।

নেকাব চ্যালেঞ্জ-এ অংশগ্রহণ করছেন এক নারী

রুমা পলকা ডট মনে করে এটি ড. সিউস-র বইয়ে সে সকল পৃষ্ঠায় চলে যাওয়ার মতো যেখানে দেয়ালে পলকা ডট, চেয়ারে পলকা ডট এবং বাসন-কোসনে পলকা ডট। এমনকি টেলিভিশন, টিস্যু বক্স এবং তোয়ালেও ফোটাযুক্ত।

ইন্দদরী ব্যাখ্যা করেন, “একজন মহিলা নেকাব পরার পর আমি সাধারণত জিজ্ঞেস করি, নেকাব পরার পর আপনার কেমন লাগছে?” “তারা বলে, নেকাব পরার আগে আমি ভাবিনি আমি নিশ্বাস নিতে পারবো”. তারা ভাবে এটি গরম এবং অস্বস্তিকর হবে কিন্তু নেকাব পরার পর তারা বলে আগের চেয়ে প্রশান্তি অনুভব করছে, তারা নিরাপদ অনুভব করে।

১৯৯৮ সালে স্বৈরাচারী রাষ্ট্রপতি সুহার্তোর পতনের পর থেকে ইন্দোনেশিয়ান মহিলারা আরও বেশি হিজাব পরা শুরু করে, এটি একটি স্কার্ফ যা ঘাড় এবং চুল ঢেকে রাখে কিন্তু মুখ খোলা রাখে, একই সাথে এটি সমাজের ইসলামীকরণের উন্নতি করে।

যাইহোক অনেক বেশি ঢেকে রাখা নেকাব যা বোরকার মতো, বিশেষ সন্দেহের চোখে দেখা হয়। হিজাব পরে এমন একজন মহিলার স্বামী বলেন, “আমি মুসলিম, কিন্তু এটা আমি পছন্দ করি না, এটা থেকে মনে হয় সে কট্টরপন্থী।”

একটি অপ্রয়োজনীয় আরব আমদানি

অনেক ইন্দোনেশিয়ান মনে করেন, নেকাব একটি অপ্রয়োজনীয় সাংস্কৃতিক আমদানি যা সৌদি আরবের মতো দেশ থেকে এসেছে যা রক্ষণশীল ও বিশুব্ধ ইসলামিক প্রথার অনুশীলনে উৎসাহ দেয়। এটি ইন্দোনেশিয়ার শিক্ষা ব্যবস্থায় ওয়াহাবিজম নামে পরিচিত।

২০১৫ সালে জাকার্তা ভিত্তিক ‘আলভারা রিসার্চ সেন্টার’-র একটি পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, নগরকেন্দ্রিক ইন্দোনেশিয়ান নারীদের মধ্যে ৭৯.৪ শতাংশ আদর্শ মাপের হিজাব পরিধান করে এবং লম্বা হিজাবের বিরোধিতা করে।

লিলিক পুরাভান্দি নামক একজন বলেন, “মধ্যপ্রাচ্য এবং এখানকার হিজাবের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।” নেকাবের ক্ষেত্রে দুই শতাংশেরও কম এটি গ্রহন করতে সম্মতি দিয়েছ্।

গত মাসে ইন্দোনেশিয়ায় সেন্ট্রাল জায়ার একটি বেসরকারি ইসলামিক স্কুলের ক্লাসরুমের ভিডিও ভাইরাল হলে একটি বিক্ষোভের সম্মুখীন হয়। যেখানে ইউনিফর্ম হিসেবে হিজাব সংযুক্ত করা হয়। স্থানীয় শিক্ষা মন্ত্রণালয় স্কুলটিকে এই মাসের শুরুতেই ইউনিফর্ম পলিসি সংশোধন করতে বলেন। কেননা এটি সরকারি নীতি অনুসারে হয়নি।

ইন্দদরী বলেন, ইন্দোনেশিয়ার নেকাব পরা নারীদের ক্ষেত্রে ‘খারাপ ধারণা’ প্রচলিত আছে। ধারণা করা হয় তাদের সন্ত্রাসী এবং নিনজাদের সাথে সংযোগ আছে। যেখানে ইন্দোনেশিয়ার প্রথম আত্মঘাতী বোমাহামলাকারী নারী দিয়ান জুলিয়া নোভি; যিনি আদালতে নেকাব পরিধেয় অবস্থায় ছিলেন। এবং এটি মিডিয়ায় ফলাও করে প্রচার করা হয়।

২০১৪ সালের শেষের দিকে যখন ইন্দদরী নেকাব পরা শুরু করে তার বন্ধুদের কয়েকজন ছেড়ে চলে যায়। তারা মনে করে যারা নেকাব পরে তারা একগুঁয়ে ও অন্তর্মুখী হয় এবং এদের সঙ্গ ত্যাগ করা উচিত”। আমি বুঝতে পারি না এই মতবাদটি যে নেকাব পরা ব্যক্তিরা বাতিকগ্রস্থ কেন হবে! আমি সর্বদা সুন্দর হওয়া চেষ্টা করি। নবীজী তার স্ত্রীদের নেকাব পরিয়ে দিতেন এবং ইসলাম হিজাব এবং নিকাব পরার শিক্ষা দেয়।

পলকা ডটের রানী

অতীত জীবনে একজন ইন্দোনেশিয়ান সেলিব্রেটির স্ত্রী ইন্দদরী হিজাব স্টাইলিস্ট ছিলেন। তিনি মডেলযুক্ত একটি হিজাব টিউটোরিয়াল বই রচনা করেছিলেন যেখানে কিভাবে দৃষ্টিনন্দন পার্টি হিজাব তৈরি করা যায়।

ইন্দদরী মিন্দ্রায়ন্তী-র অতীত জীবন

একদিকে মাথা থেকে পা পর্যন্ত সবুজ ডোরাকাটা ও সাদা পলকা ডট দিয়ে সবুজ চটি জুতোর সাথে একটি হিজাব ডিজাইন করেন। “আমার হিজাবগুলো এত খারাপ হয়ে গেলো যে আমি পালকের মতো অলংকার ব্যবহার করেছিলাম। আসলে ইসলাম হিজাবে অলংকার অনুমোদন করেনা।”

তিনি কিছু বই আমাদের দিলেন। কিন্তু বেশিরভাগ বইই প্রকাশককে ফেরত দেয়া হলো কারন ইন্দদরী সেগুলোকে আর ডিস্ট্রিবিউট করতে দেবেন না।

ইন্দদরীর সিদ্ধান্ত ছিল নেকাব পরা শুরু করা। তিনি বলেন  “আমি অনেক কিছুই করেছি কিন্তু সুখ অনুভব করিনি কেননা আমি আল্লাহর নির্ধারিত নীতির বাইরে চলে এসেছি।”

ইসলামে নেকাব পরা সুন্নাহ, সুন্নাহ অর্থ যদি আমরা বিধান বাস্তবায়ন করি, তবে আমরা পুরস্কৃত হবো। এটা কোন দমননীতি নয়, বরং এটা আল্লাহর প্রতি ইসলামিক নারীদের ভালোবাসার প্রমান।

ইন্দদরী বলেন, বোনাস হিসেবে পাওয়া যাচ্ছে যে, নেকাব নারীদের হয়রানি ও পুরুষের কু-দৃষ্টি থেকে রক্ষা করে। “আমি আমার কিছু পুরুষ বন্ধুদের কাছে মতামত চাইলাম। তারা বললো যখন তারা নেকাব পরা নারীদের সাথে কথা বলে তারা নোংরা চিন্তা  করে না। তারা তাদের সম্মান করে।

নেকাব এবং নারীর ক্যারিয়ার

জাকার্তার কোরান বিজ্ঞান কলেজের নারী ইসলামিক স্কলারস এবং স্নাতকোত্তর প্রভাষক ড. নূর রফিয়া বিল উজম বলেন যে নেকাব পরা ইন্দোনেশিয়ান ঐতিহ্যে নেই। তিনি বলেন “যখন কেউ ইসলাম অনুসারে জীবন যাপন শুরু করে তখন কি ঘটে: তারা আরব হওয়ার দিকে ঝুঁকে পড়ে।”

“মানুষ ভুল বোঝে এবং চিন্তা করে ‘আধুনিকতা’ মানে ‘পাশ্চাত্য’ আর ‘ইসলাম’ মানে ‘আরব’। আমরা ‘পাশ্চাত্যায়ণ’ বা আরব হওয়া ছাড়াই আধুনিক ইন্দোনেশিয়ান নারী হতে পারি।” ড. নূর বলেন যে তিনি নারীদের নেকাব পরার অধিকারকে শ্রদ্ধা করেন যদি তারা তা নিজেদের বিবেকের সিদ্ধান্তে গ্রহণ করেন।

“সম্ভবত তারা মনে করে, নির্দিষ্ট এই পোষাক পরে তারা স্রষ্ট্রার কাছাকাছি অনুভব করে। কিন্তু আমাদের সতর্ক থাকতে হবে যে আমরা যেন আধ্যাত্মিকভাবে অহংকারী হয়ে না যাই।”

তিনি আরও সতর্ক করেন যে, “সাধারণত নেকাব তাদের জন্য একটি ব্যবস্থাপনা হবে যারা কাজে যেতে পারে না, বাড়িতে থাকতে হয় তাদের জন্য; নারীদের অবশ্যই তার স্বামীকে মান্য করতে হবে।

ইন্দদরী ‘নেকাব স্কোয়াড’র কাছে একটা কথা ছড়িয়ে দেয়ার আশা করেন।তা হলো একজন নেকাব পরিহিতা ডাক্তার, আইনজীবী, তায়েকয়োন্ডে মার্শাল আর্ট অনুশীলনকারী এবং মেহেদী শিল্পী হতে পারবেন।

ইন্দদরী এবং একজন নারী মুসলিম চর্মরোগবিশেষজ্ঞ ত্বক এবং সৌন্দর্য নিয়ে বথা বলেন। ইন্দদরী বলেন, “আমি আশা করি সে উপস্থিতিকে উৎসাহ দেবে। আমি সবাইকে বলতে চাই যে যদি নেকাব পরেন তারা এখনই কার্যকর করতে পারেন।”

‘নেকাব স্কোয়াড’ প্রতিষ্ঠিত হয় এই বছর ফেব্রুয়ারিতে পূর্ব জাকার্তার একটি মসজিদে। ইন্দদরী বলেন, “আমি মনে করি এটা ভালো যে সবাইকে একত্রিত করা যারা নেকাব পরে এবং একটি কমিউনিটি তৈরি করা যাতে তার একাকিত্ব অনুভব না করে।

বর্তমানে ইন্দোনেশিয়ার বেকাসি, ইয়োগাকার্তা ও বন্দুং শহরে এর শাখা রয়েছে। এমনকি তাইওয়ান, মালয়েশিয়া এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় এর কাজ এগিয়েছে।

একজন পুরুষ অনুপ্রবেশকারী

‘নেকাব স্কোয়াড সারা শহরে রবিবারে ত্রাণ, বিবাহ র্প্বূ সেমিনার, ব্যবসায়িক কর্মশালা, রোহিঙ্গাদের জন্য তহবিল সংগ্রহ, নেকাব চ্যালেঞ্জ এবং কোরান-পাঠের ক্লাসের মতো কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

যাইহোক, ‘একজন পুরুষ যার নারীদের মতো একটি নাম আছে কোরান শিক্ষার ক্লাসে যোগ দিতে যাওয়ার পর থেকে বোগোর এলাকার ‘নেকাব স্কোয়াড একটা নিয়ম জারি করে, যে নারীদের তার মুখ দেখাতে হবে। বোগোর শাখার একজন নেকাব পরিহিতা বলেন, “ কিছু পুরুষের অবগুণ্ঠিতা বা ঘোমটা দেয়া নারীদের ক্ষেত্রে যৌন খেয়াল কাজ করে।”

নেকাব স্কোয়াডের কয়েকজন স্মার্টফোন ব্যবহার করছে

‘নেকাব স্কোয়াড’র কেউ কেউ ফেসবুক এবং ইন্সটাগ্রাম ব্যবহার করেন তাদের কাছের প্রচারণার জন্য। যদিও সেলফি তোলায় নিরুৎসাহিত করা হয়। “আমার সেলফি তুলতে পারি কিন্তু তা আমাদের জন্য রাখি আমরা তা পোস্ট করিনা।” ইন্দদরী বলেন। যেহেতু নেকাবের ধারণা আপনার নিজস্ব তাই জনগণের মনোযোগ আকর্ষন করা উচিত নয়।

জাকার্তার আবহাওয়ায় এই নেকাব ঘেমে উঠবে, যতক্ষণ না ইন্দদরী আরবীয় ‘ছিফোন’ বা ঠাণ্ডা উপাদান ব্যবহার না করছেন। যাইহোক এটি আমার মুখে এটে থাকবে না এবং যতটা শ্বাসরোধী ভেবেছিলাম ততটাও না।

এবং এটি আমার চোখ খোলা রাখে তাদের মধ্যে বৈচিত্র আনতে যারা ঘোমটা ব্যবহার করে। এখন সবসময় আমি নেকাব পরিহিতা কাওকে দেখলে সাহায্য করতে পারি না কিন্তু আমি ইন্দদরীর কথা চিন্তা করি এবং চিন্তা করি তার পাগলামোর ‘রুমা পলকাডট’র চাপা হাসির নেকাব পরিহিতাদের কথা।


লেখাটি গত ২০১৭ সালের ২৪ নভেম্বর ‘দি সিডনি মনিং হেরাল্ড’-এ প্রকাশিত হয়। লেখক পত্রিকাটির ন্যাশনাল করেসপন্ডেন্ট জুয়েল টপসফিল্ড।