শুভ জন্মদিন মুলহল্যান্ড ম্যান

শুভ জন্মদিন মুলহল্যান্ড ম্যান

তিনি হলিউডের অন্যতম প্রতিভাবান অভিনেতা। ১২টি মনোনয়ন নিয়ে ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি অস্কার মনোনয়ন অর্জনকারী এই অভিনেতা তিনটা অস্কার ঘরে আনেন। দুইবার সেরা অভিনেতা ও একবার সেরা পার্শ্ব অভিনেতার চরিত্র তাকে এনে দেয় চলচিত্র জগতের সেরা এই সম্মাননা। অভিনয়ের জগতে আছেন ছয় দশক হল। এর মধ্যে আমাদের উপহার দিয়েছেন ‘ওয়ান ফ্লিউ ওভার দ্য কাকু’স নেস্ট’, ‘দ্য শাইনিং’, ‘অ্যাজ গুড অ্যাজ ইট গেটস’, ‘চায়নাটাউন’, ‘ব্যাটম্যান’, ‘দ্য ডিপার্টেড’-এর মতো সিনেমাগুলো। হ্যাঁ এতক্ষণে নিশ্চয়ই বুঝে গেছেন কার কথা বলা হচ্ছে। হলিউডের ইতিহাসের অন্যতম সেরা অভিনেতা জ্যাক নিকলসনকে নিয়েই বলছি। তিনি আজ ৮১ বছরে পা দিলেন।

মায়ের আদরে বোনের কোলে বড় হওয়া 

জ্যাক নিকলসনের জন্ম হয় ১৯৩৭ সালের ২২ই এপ্রিল, যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির ন্যাপচুন শহরে। সেখানেই কাটে তার শৈশব। তার বাবা-মায়ের পরিচয় নিয়ে একটা অদ্ভুদ ঘটনা রয়েছে যা ১৯৭৪ সালে খোলসা হয়। জ্যাক যখন ছোট তখন সবাই জানত তার বাবা ছিল জন নিকলসন এবং মা ইথেল নিকলসন। তিনি তার বোন জুন নিকলসনের কাছেই বেড়ে ওঠে। সব ঠিকঠাকই ছিল কিন্তু ১৯৭৪ সালে যখন যখন টাইম ম্যাগাজিন জ্যাক নিকলসনকে নিয়ে একটা কভার স্টোরি করার জন্য তার অতীত ঘাটতে থাকে তখন  কিছু অদ্ভুদ তথ্য বেরিয়ে আসে। জুন ফ্রান্সিস নামে তার বড় বোন ছিল যার কাছে তিনি বড় হয়েছেন। কিন্ত জুন আসলে তার বড় বোন ছিলেন না, বরং তার মা ছিলেন। এই অদ্ভুত সত্যটা উদ্ঘাটিত হয় টাইম ম্যাগাজিনের কভার স্টোরিতে। জ্যাক নিকলসনের যখন জন্ম হয় তখন তার মা জুন ছিলেন অবিবাহিত। জ্যাকের সত্যিকারের বাবার পরিচয় কখনও মেলেনি তাই জ্যাকের নানা-নানি মেয়েকে বদনাম থেকে রক্ষা করতে জ্যাককে নিজেদের সন্তান হিসেবে পরিচয় দেন এবং জুন তখন হয়ে যায় জ্যাকের বড় বোন। জ্যাক নিকলসন নিজেও এত বছর অব্দি নিজের মা অর্থাৎ জুন-কে মনে করতেন তার বড় বোন আর নানা-নানিকে ভাবতেন তার বাবা-মা। ১৯৭৪ সালে প্রথমবারের মতো বেরিয়ে আসে এই সত্য এবং ছত্রিশ বছর বয়সী জ্যাক নিজেও প্রথমবারের মতো জানতে পারেন এই ঘটনা।

পড়ালেখা ছেড়ে দিয়ে শাপেবর

জ্যাক নিকলসন পড়াশোনা করতেন ন্যাপচুনের মাসানকান স্কুলে। কিশোর বয়স থেকেই ছাত্র হিসেবে ছিলেন যথেষ্ট ভাল। তিনি স্কুল শেষ করে কলেজ যাওয়া থেকে বিরত থাকেন কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন কলেজে যাওয়ার জন্যে এখনো অনেক সময় বাকি আছে। তখন তিনি তার বোনকে (জুন) নিয়ে লস এঞ্জেলসে পাড়ি জমান। সংসার খরচ চালাতে তখন একটা খেলনার দোকানে চাকরির পাশাপাশি এমজিএম-এর কার্টুন বিভাগের বার্তাবাহক হিসেবে খন্ডকালীন কাজ শুরু করেন। তখনই সুদর্শন জ্যাক নিকলসন এমজিএম এর একজন পরিচালক জো পেসটারন্যাকের নজরে আসেন। পেসটারন্যাক তখন এমজিএম এর বিখ্যাত প্রশিক্ষক জেফ কোরি-র ক্লাসে নিকলসনকে সুযোগ করে দেয় অভিনয় শেখার জন্যে।

অভিনয়ে পদার্পন

জ্যাক নিকলসনের অভিনয় জীবন শুরু হয় ১৯৫৮ সালে ‘দ্য ক্রাই বেবি কিলার’ সিনেমার মাধ্যমে। এই সিনেমাতে তিনি একজন কিশোর বালকের চরিত্রে অভিনয় করেন যে কিনা ভুলক্রমে নিজেকে খুনি মনে করে। সত্তরের দশকের আগে অনেকটাই অখ্যাত চিলেন তিনি। বিজ্ঞাপনে ছোটখাট চরিত্রে অভিনয় করেই পেট চালিয়েছেন। মাঝেমধ্যে চিত্রনাট্য লেখার কাজ করেছেন। এছাড়া কতিপয় কম বাজেটের ওয়েস্টার্ন সিনেমায় অভিনয় করে। ১৯৬৯ সালের সিনেমা ‘ইজি রাইডার’ এ মদ্যপ আইনজীবির চরিত্র দিয়ে দিয়ে প্রথমবারের মতো পাদপ্রদীপের আলোয় আসেন তিনি। এই সিনেমার সুবাদেই জ্যাক পান বিশজোড়া পরিচিতি ও সেরা পার্শ্ব অভিনেতা হিসেবে অর্জন করেন তার অভিনয় জীবনের প্রথম অস্কার মনোনয়নে। ১৯৭০ সালে ফাইভ ইজি পিসেস তাকে আবারও অস্কার মনোয়ন এনে দেয়। এবার তিনি সেরা অভিনেতার চরিত্রে মনোয়ন পান। অস্কার না জিতলেও ১৯৭২ সালেই নিকলসনের ক্যারিয়ারে এসেছিল সুবর্ণ সুযোগ। ফ্রান্সিস ফোর্ড কপোলার কালজয়ী সিনেমা ‘দ্য গডফাদার’-এ অ্যাল পাচিনো অভিনীত মাইকেল কর্লিয়নির চরিত্রটির জন্য প্রথমে ভাবা হয়েছিল তারই কথা। জ্যাক নিকলসন তা ফিরিয়ে দেন। ১৯৭৩ সালে আবারও অস্কার মনোয়ন পান জ্যাক নিকলসন। এবার পান ‘দ্য লাস্ট ডিটেইলস’র জন্যে।

খ্যাতির শীর্ষে

নিকলসন তখন হলিউডে নিজের সফলতা জারি রাখেন। ১৯৭৪ সালে রোমান পোলান্সকির ধ্রুপদী সিনেমা চায়না টাউনে বেসরকারি গোয়েন্দার চরিত্র তাকে এনে দেয় চতুর্থ অস্কার মনোয়ন কিন্ত তার দুর্ভাগ্য আর্ট কার্নি ‘হ্যারি এন্ড টন্টো’-এর হ্যারি চরিত্রের জন্যে অস্কার জিতে নিলে এবারও অস্কার তার জন্যে অধরাই হয়ে থাকে। কিন্ত পরের বছরই, ১৯৭৫ সালে কেন কেসি-র বিখ্যাত উপন্যাস অবলম্বনে করা সিনেমা ‘ওয়ান ফ্লিউ ওভার দ্য কাকু’স নেস্ট’ এর জন্যে তিনি পান পঞ্চম অস্কার মনোয়ন এবং তার প্রথম অস্কার পুরষ্কার। এই বিখ্যাত সিনেমার মাধ্যমে চলে আসেন খ্যাতির শীর্ষে। ১৯৮০ সালে তিনি আবারো সবাইকে তাক লাগিয়ে দেন স্টেফেন কিং এর বিখ্যাত উপন্যাস অবলম্বনে ভৌতিক সিনেমা ‘দ্য শাইনিঙ’ এ অভিনয়ের মাধ্যমে, যেখানে তিনি অভিনয়ের দিক থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে যান এবং প্রশংসিত হন তার চরিত্রটির জন্যে। ১৯৮৪ সালে তিনি আবারো অস্কার ঘরে তোলেন। এবার জিতেন ‘টার্মস অব এনডার্নমেন্ট’ সিনেমাতে সেরা পার্শ্ব চরিত্রের জন্যে।

আশির দশকে আরো কয়েকটা সিনেমার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ১৯৮৯ সালে ‘ব্যাটম্যান’। তিনি ব্যাটম্যান সিনেমায় মানসিক বিকারগ্রস্থ ভিলেন, জোকারের অভিনয় করে যথেষ্ট আলোচিত হন। ১৯৯১ সালে তিনি ফিরিয়ে দেন ‘দ্য সাইলেন্স অফ দ্য ল্যাম্বস’-এর কুখ্যাত মানুষখেকো সিরিয়াল কিলার হ্যানিবল লেক্টারের চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব। এই চরিত্রে অভিনয় করে সেরা অভিনেতার অস্কার জয় করেছিলেন স্যার অ্যান্থনি হপকিন্স। জ্যাক নিকলসন আবারো নিজেকে সেরা প্রমাণিত করেন ১৯৯৮ সালে নিজের তৃতীয় অস্কার জিতে। ১৯৯৭ সালে মুক্তি পাওয়া ‘এজ গুড এজ ইট গেটস’ সিনেমায় মানববিদ্বেষী লেখকের চরিত্রের জন্যে জ্যাক নিকলসন সেরা অভিনেতার পুরষ্কার জয় করেন। এরপর ২০০৩ সালে আরো একবার অস্কারের মনোয়ন পেলেও সেবার অবশ্য এই গুণী অভিনেতার হাতে অস্কার ওঠেনি। এছাড়া তার অভিনীত আরো কয়েকটা সিনেমার মধ্যে ‘দ্যা লাস্ট ডিটেইলস (১৯৭৪)’, ‘ফিউ গুড ম্যান (১৯৯৩)’, ‘এবাউট ইশ্মিড (২০০৩)’, ‘সামথিংস গট্টা গিভ (২০০৩)’, ‘দ্য ডিপার্টেড (২০০৬)’, ‘দ্য বাকেট লিস্ট (২০০৭)’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

জ্যাক নিকলসন নিঃসন্দেহে তার প্রজন্মের অন্যতম সেরা অভিনেতা। তার সবচেয়ে বড় গুণ ছিল তার অভিনয়ের বৈচিত্রতা। সকল চরিত্রে খাপ খাইয়ে নেয়াই ছিল তার সবচেয়ে বড় গুণ যার জন্যে তাকে তার প্রজন্মের সবচেয়ে রহস্যময় অভিনেতা বলা হয়। ২০১৩ সালে ৭৬ বছর বয়সে তিনি হলিউডের রুপালি জগত থেকে অবসর নেয়ার ঘোষণা দেন। তার অভিনীত শেষ সিনেমা ছিল ২০১০ সালে মুক্তি পাওয়া রোমান্টিক ড্রামা ‘হাও ডু ইউ নৌ’। কিন্ত দ্য গার্ডিয়ানের মতে ২০১৬ সালে মুক্তি পাওয়া জার্মান কমেডি ‘টনি আর্ডমানের’ হলিউড পুণঃনির্মাণে অভিনয় করার মাধ্যমে অবসর ভেঙে ফিরে আসবেন জ্যাক নিকলসন।

হলিউডের এই কিংবদন্তি অভিনেতার জন্মদিন আজ। শুভ জন্মদিন মুলহল্যান্ড ম্যান…