ফের পুতিনেই আস্থা রাশিয়ানদের

ফের পুতিনেই আস্থা রাশিয়ানদের

‘শক্তিশালী রাষ্ট্র এবং উচ্চ জীবনমান, স্বাধীন ও নিরাপদ রাশিয়া’ স্লোগানে রেখে ২০০০ সালে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে পুতিন যখন জয়লাভ করেন তখন বাইরের দুনিয়ার কাছে তিনি অনেকটাই অপরিচিত। অবশ্য এক বছর আগে ১৯৯৯ সালেই ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন তিনি। ওই সময় থেকেই রাশিয়ার রাজনীতিতে মোটামুটি পরিচিত মুখ হিসেবে আবির্ভাব ঘটে ২০০৪ সালের নির্বাচনে বিজয়ের পর ভ্লাদিমির পুতিনই হয়ে ওঠেন রাশিয়ার রাজনীতির রাজপুত্র। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর রাশিয়ার রাজনীতিতে এমন প্রভাবশালী চরিত্র আর আসেনি। সব সময়ই তিনি ছিলেন আলোচনার শীর্ষে। অবশ্য তার শুরুটা ছিল একদমই সাদামাটা।

১৯৫২ সালের ৭ অক্টোবর সেন্ট পিটার্সবার্গ যেটি তখন ছিল লেনিনগ্রাদ। এখানেই জন্ম হয় ভ্লাদিমির পুতিনের। খুবই সাধারণ পরিবারের সন্তান তিনি। দাদা পেশায় ছিলেন বাবুর্চি। রান্নায় অসাধারণ হাত থাকার সুবাদে রাজনীতির প্রবাদপুরুষ লেলিনের বাবুর্চি ছিলেন তিনি। বাবা ভ্লাদিমির স্পিরিন্দোনোভিচ নৌবাহিনীতে ছিলেন আর মা একটি ফ্যাক্টরিতে কাজ করতেন। পুতিনের এক ভাইও ছিলেন যিনি জন্মের কয়েক মাসের মধ্যেই মারা যান।

১৯৬০ সালে ভ্লাদিমির পুতিন যখন স্কুলে যাওয়া শুরু করেন তখন তার বয়স মাত্র আট বছর। তিনি গিটার বাজাতে ভালোবাসতেন। শৈশবে তার প্রিয় ছিল ভস্তকি-র ‘ভার্টিকাল’ অ্যালবামের গান। খেলাধুলাও ভালোবাসতেন তিনি। ছোটবেলাতেই নিজের প্রতিরক্ষায় মার্শাল আর্ট শেখেন। তিনি ব্ল্যাকবেল্ট প্রাপ্ত মার্শাল আর্টিস্ট। বক্সিং শেখা শুরু করলেও এতে নাক ভেঙে যাওয়ায় বেশিদূর এগোতে পারেননি। ১৯৭৫ সালে লেনিনগ্রাদ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের আন্তর্জাতিক শাখার বিশেষ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তাকে ওই সময়ের নিয়ম মেনে দেশের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বিভাগে কাজ করতে পাঠানো হয়। তিনি কাজ শুরু করেন সোভিয়েত গোয়েন্দা বাহিনী কেজিবি-র হয়ে। ১৯৮৫ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন পূর্ব জার্মানিতে যেটি তখন ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের নিয়ন্ত্রণে। এখানে ১৯৮৯ সালের শেষ পর্যন্ত ড্রেসডেন শহরের সোভিয়েত জার্মান মৈত্রী ভবনের ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করেন তিনি।

১৯৯১ সালে সোভিয়েত পতনের পরের বছর অর্থাৎ ১৯৯২ সালে পুতিন রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা পরিষদ থেকে অবসর নেন। ওই সময় ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল। এরপর সেন্ট পিটার্সবার্গের প্রশাসনের প্রধানের ফার্স্ট ডেপুটি হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি।

রাজনীতিতে পুতিনের ব্রেকথ্রু আসে ১৯৯৯ সালে। তখনকার রাষ্ট্রপতি বরিস ইয়েলৎসিনের অনুরোধে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন করেন তিনি। এর কিছুদিন আগেই ১৯৯৯ সালের মার্চে তাকে রাশিয়ার নিরাপত্তা পরিষদের সচিব নিযুক্ত করা হয় এবং একই বছরের আগস্টে মন্ত্রিসভার সভাপতি হন।

প্রধানমন্ত্রিত্বের পরে পুতিন ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। প্রথম থেকেই প্রেসিডেনসিয়াল ব্যবস্থার প্রতি আস্থাশীল ছিলেন এবং ক্ষমতা গ্রহণের পর তিনি ধীরে ধীরে দেশের কাঠামোগত পরিবর্তনের দিকে নজর দেন। রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণাধীন চেচনিয়ায় দ্বিতীয় চেচেন যুদ্ধের মাধ্যমে অঙ্গরাজ্যগুলোর অখণ্ডতা বজায় রাখার জন্য তার জনপ্রিয়তা তৈরি হয়। এরপরই আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ইউনাইটেড পার্টি’তে যোগ দেন। এটি এখন ‘ইউনাইটেড রাশিয়া পার্টি’ নামে পরিচিত। এরপর ২০০০ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত টানা দুইবার রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট এর দায়িত্ব পালন করেন। তিনি রাষ্ট্রপতি থাকাকালে রাশিয়ায় জিডিপি ৭২ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। দারিদ্র্য কমপক্ষে ৫০ শতাংশ কমে যায়। এটি ছিল তখনকার রাশিয়ান অর্থনীতির অনেক বড় প্রাপ্তি। প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় তিনি লভ্যাংশের ওপর কর হ্রাসসহ ১৩ শতাংশ হারে আয়কর ধার্যের বিষয়ে আইন পাস করেন। জ্বালানি নীতি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করার ফলে রাশিয়া জ্বালানি খাতে বৃহৎ শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। তবুও সাংবিধানিক বাধ্যবাধ্যকতার কারণে ধারাবাহিকভাবে তৃতীয় মেয়াদের জন্য রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি তিনি। পরে ২০০৮ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তার উত্তরসূরি হিসেবে দিমিত্রি মেদভেদেভ বিজয় লাভ করলে ভ্লাদিমির পুতিনকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মনোনীত করেন তিনি।

এরপর আবারও ২০১২ সালে ৬৩ দশমিক ৬ শতাংশ ভোট পেয়ে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে দুনিয়ার অন্যতম প্রভাবশালী রাষ্ট্রনেতা হিসেবে আভির্ভূত হন ভ্লাদিমির পুতিন। ক্ষমতায় আসার পর পরই দুনিয়াব্যাপী তার প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রথমেই তিনি বাইরের দিকে নজর দেন এবং ২০১৪ সালে দাপটের সঙ্গেই ক্রিমিয়া দখলের করেন। ইউক্রেন-এর সরকার বিরোধী আন্দোলন শুরু হলে সেখানে ব্যাপকভাবে রুশবিরোধী প্রচার শুরু হয়। এমনকি ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে সরকার বিরোধী বিক্ষোভ চলার সময় বিক্ষোভকারীরা সোভিয়েত নেতা লেনিন, কিরভ ও দেরঝিনস্কির ভাস্কর্য ভেঙে ফেলে। সোভিয়েত বিরোধী ওই মনোভাব তাকে ভয় পাইয়ে দেয়। ওই একই ধরনের বিক্ষোভ রাশিয়াতেও হতে পারে ভেবে ক্রিমিয়া দখল করে নেন তিনি। রাশিয়ার প্রত্যক্ষ মদদে আয়োজিত ক্রিমিয়ার গণভোটে রাশিয়ায় যোগ দেয়ার পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পড়ে। অবশ্য অধিকাংশ আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকের মতে, ক্রিমিয়া দখলের পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ ছিল। এর মধ্যে একটি হচ্ছে, ইউক্রেনে রয়েছে গ্যাস ও তেলের বিশাল ভাণ্ডার।

মার্কিন সাময়িকী ‘ফোর্বস’-এর সবচেয়ে ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের তালিকায় ২০১৭ পর্যন্ত পর পর চারবার শীর্ষস্থান ধরে রেখেছেন প্রভাবশালী ওই রুশ প্রেসিডেন্ট। সম্প্রতি পুতিনের সব থেকে বড় পদক্ষেপ ছিল সিরিয়া যুদ্ধে অংশগ্রহণ। সিরিয়ায় বিদ্রোহ শুরু হলে বাশার আল আসাদের সরকারকে রাশিয়াই সবার আগে প্রথমে সহযোগিতা করেন। রাশিয়ার ওই প্রকাশ্য অবস্থান ও সরাসরি হস্তক্ষেপের ফলে সিরিয়া সংকটে এক স্পষ্ট মেরুকরণ তৈরি হয়। এর প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুরু করে ইরান, তুরস্ক- সবাই ওই ভূরাজনৈতিক সমীকরণে ভালোভাবেই জড়িয়ে পড়ে। এমনকি তার বিরুদ্ধে ২০১৭ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন প্রভাবিত করার অভিযোগও ওঠে।

এত কিছুর পরও খোদ রাশিয়াতেই পুতিনকে দেখা হয় আধিপত্যবাদী হিসেবে। তার বিরুদ্ধে নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার ও প্রতিদ্বন্দ্বীদের ওপর নিপীড়নসহ বেশ কিছু অভিযোগ উঠেছে। এবারের নির্বাচনেও তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন সাতজন। তাদের মধ্যে ছিলেন বামপন্থী ধনকুবের পাভেল গ্রুদিনিন ও সাবেক টিভি উপস্থাপক কেসেনিয়া সোবচাক। এর উপর পুতিনের প্রধান বিরোধী আলেক্সেই নাভালনি-কে নির্বাচনে দাঁড়াতে দেয়া হয়নি। নাভালনি তার সমর্থকদের ওই নির্বাচন বয়কট করার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

নির্বাচনের আগে পুতিনের অন্যতম সমালোচক দেশটির দাবার গ্র্যান্ডমাস্টার গ্যারি ক্যাসপারভ-এর বলেছিলেন, ‘রাশিয়ার রাজনৈতিক ক্ষমতার পুরো কাঠামোটি আসলে এক ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল। আর তিনি হলেন পুতিন। পরিস্থিতি এমন যে, পুতিনের মৃত্যুর পর কী হবে, কে ক্ষমতায় আসবেন তা কেউ জানেন না।’ আজকের নির্বাচনের ফলে সম্ভবত রাশিয়াকে সেদিকেই আরো এক ধাপ এগিয়ে দিল।