তিয়ানমেন ছাত্র আন্দোলন
রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পর চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লব ছিল এক অসাধারণ ঘটনা। ওই বিপ্লবের মাধ্যমেই চেয়ারম্যান মাও জে দংয়ের নেতৃত্বে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করে চীনের জনগণ। কিন্তু দিন যত যাচ্ছিল ততই স্বপ্নগুলাে ক্রমে ফিকে হয়ে আসতে লাগলো চীনের জনগণের সামনে। ১৯৭৬ সালে মাও জে দং মারা যাওয়ার পর যেন আর কিছুই বাকি থাকলো না তাদের সামনে। একদিকে যেমন দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে যাচ্ছিল, অন্যদিকে তেমনি দেশ ক্রমেই খাদ্য সংকটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। তাই চীনের জনগণের দরকার ছিল আরেকটি লড়াই।

এ অবস্থায় ১৯৮৬ সালে চীনের তৎকালীন সংস্কারপন্থী নেতা হু ইয়াওবেংয়ের হাত ধরে ধীরে ধীরে গড়ে উঠতে থাকে ছাত্র আন্দোলন। ফলস্বরূপ কমিউনিস্ট পার্টি ১৯৮৭ সালে তাকে বরখাস্ত করে পার্টি থেকে। কিন্তু ঝামেলাটা বাধে ১৯৮৯ সালে যখন হঠাৎ করেই তিনি মারা যান। তার মৃত্যু ঘিরে ছাত্ররা তিয়ানমেন স্কয়ার-এ জড়ো হয়। সরকারের পক্ষ থেকে সাবেক ওই নেতার মৃত্যুতে সম্মান জানানো না হলে ছাত্রদের ভেতরের ক্ষোভ এক সময় অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। হাজারাে ছাত্র সেদিন মুক্তমতের পক্ষে তিয়ানমেন স্কয়ারে সমাবেত হয়। ওই ঘটনায় টনক নড়ে চীনা কমিউনিস্ট সরকারের। ছাত্রদের দমন করতে সরকার সেনা পাঠালে বিক্ষোভ দ্রুতই সংঘর্ষে রূপ নেয়। ছাত্রদের ওপর গুলিসহ ভারী অস্ত্রের প্রয়োগ করে হাজারাে ছাত্রকে সেনাবাহিনী হত্যা করে লাশ তিয়ানমেন স্কয়ার থেকে সরিয়ে ফেলে। ওই ঘটনার পর থেকেই চীনে অদ্ভুতভাবে ছাত্র আন্দোলন নিয়ে সব প্রচারের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। অবশ্য ওই দিনটি ভুলে যেতে চায় চীন সরকার। কিন্তু প্রতি বছর ৪ জুন দুনিয়াজুড়েই অমানবিক ওই হত্যার স্মরণ করে থাকে হাজারো মানুষ।
১৯৭৯ সালে ইরানে ছাত্র আন্দোলন

১৯৭৯ সালের ৪ নভেম্বর তেহরানে অবস্থিত তৎকালীন মার্কিন দূতাবাস দখল করে নেয় ইরানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল ছাত্র। এরপর থেকে ওই দিবসের স্মরণে প্রতি বছরই দিনটিকে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী দিবস হিসেবে পালন করে ইরান। ১৯৭৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি মরহুম ইমাম খামেনি (রহ.)-এর নেতৃত্বে ইরানে ইসলামি বিপ্লব বিজয় লাভ করে। এর সঙ্গে সঙ্গে অবসান হয় আড়াই হাজার বছরের রাজতন্ত্রের। সাবেক ওই স্বৈরশাসনের পিছনে প্রত্যক্ষই মদদ দিয়ে আসছিল যুক্তরাষ্ট্র। ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান-এর নবগঠিত বিপ্লবী সরকার গঠন হওয়ার পরও যুক্তরাষ্ট্র তার তদবির চালু রাখে। তেহরান-এ অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস থেকে যে ব্যাপক ষড়যন্ত্রের জাল বিছানো হচ্ছে- এমন কথা বাজারে চাউর হওয়ার পরই ফুঁসে ওঠে ইরানের বিপ্লবী ছাত্র সমাজ।
১৯৭৯ সালের ৪ নভেম্বর ইরানের ছাত্ররা তেহরানে মার্কিন দূতাবাস দখল নিয়ে ৫২ কূটনীতিককে আটক করে রাখে। দূতাবাস দখলের পর ছাত্রদের মুখপাত্র মাসৌমেহ ইবতেখার দাবি করেন, তারা ছদ্মবেশী গুপ্তচর যারা ইরানের ক্ষতি করার চেষ্টা করছে। এভাবে দীর্ঘদিন ধরে অবরুদ্ধ অবস্থা চলার পর মার্কিন সরকার পরে তেহরানের বিপ্লবী সরকারের দেয়া শর্তগুলো মেনে চলার অঙ্গীকারের বিনিময়ে ওই কূটনীতিকদের মুক্ত করে নেয়। সমসাময়িক বিশ্বের ইতিহাসে ওই ঘটনাটি ছিল নজিরবিহীন। একই সঙ্গে ওই আন্দোলনে ছাত্রদের পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকরা ব্যাপকভাবে যুক্ত হয়।
হংকংয়ের আমব্রেলা মুভমেন্ট
২০১৪ সালে গণতন্ত্রের দাবিতে চীন নিয়ন্ত্রিত হংকংয়ের রাস্তায় ছাত্ররা ছাতা মাথায় দিয়ে এক অভিনব প্রতিবাদ শুরু করে। এটিকে বলা হয় ‘আমব্রেলা মুভমেন্ট’। ব্রিটিশদের কাছ থেকে হংকংয়ের মালিকানা চীনের হাতে দিয়ে দেয়ার পর কথা ছিল এখানে এক দেশ দুই নীতি চালু থাকবে। স্বায়ত্তশাসন আর বিচার ব্যবস্থা স্বাধীন রাখার কথাও বলা হয়েছিল ওই চুক্তিতে। কিন্তু বাস্তবে এর উল্টোই দেখা গেছে। এ রকম অবস্থায় ২০১৪ সালে চীন সরকার হংকংয়ে নিয়ন্ত্রিত ভোট ব্যবস্থা চালুর ঘোষণা দিলে সেখানে গণতন্ত্রের দাবিতে ছাত্র বিক্ষোভ শুরু হয়। ওই আন্দোলন এতটাই আলোচনার সৃষ্টি করে যে, ওই বছর শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের তালিকাতেও এর নাম উঠে আসে।
দক্ষিণ আফ্রিকার সোয়েতো ছাত্র আন্দোলন

ভাষা আন্দোলনের নাম শুনলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে আসে ১৯৫২ সালের নাম। কিন্তু ইতিহাস বলে, দুনিয়াজুড়ে যত ভাষা আন্দোলন হয়েছে এর মধ্যে ভাষার জন্য সব থেকে বেশি প্রাণ দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার জনগণ। ধারণা করা হয়, ৬০০ জনেরও বেশি সেদিন প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন মাতৃভাষার জন্য।
বর্ণবিদ্বেষমূলক রাজনীতিতে দক্ষিণ আফ্রিকা হলো অন্যতম প্রধান চরিত্র। বর্ণবিদ্বেষের কারণেই দীর্ঘ ২৯ বছর কারাগারে অন্তরীণ করে রাখা হয় অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা-কে। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবৈষম্যের সঙ্গে সঙ্গে ভাষার রাজনীতি ছিল ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দক্ষিণ আফ্রিকার ইংরেজি ও ডাচ উপনিবেশকারীদের মধ্যে প্রচলিত ছিল আফ্রিকানস ভাষা। কিন্তু সেখানকার উপজাতিদের ভাষা ছিল আলাদা। ১৯৭৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার সরকার জারি করে এক ফরমান। সেখানে বলা হয়, আফ্রিকানস ভাষাই হবে কৃষ্ণাঙ্গদের স্কুলের ভাষা। ওই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই গর্জে ওঠে কৃষ্ণাঙ্গ স্কুল শিক্ষার্থীরা। শুরু হয় আন্দোলন। তাদের ওই আন্দোলনের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। ১৯৭৬ সালের ১৬ জুন প্রায় ২০ হাজার কৃষ্ণাঙ্গ ছাত্রছাত্রী সোয়েতো শহরের রাস্তায় বিক্ষোভ শুরু করে। তাদের ওই বিক্ষোভে শামিল হন বিবেকবান শেতাঙ্গরাও। পুলিশ ওই বিক্ষোভে হামলা করে ৬০০ জনের বেশি মানুষকে হত্যা করে। ভাষার ঔপনিবেশায়নের জলজ্যান্ত নমুনা হয়তো এটিকেও বলা যায়।
১৯৬৮ সালের ফরাসি ছাত্র আন্দোলন
তখন ভিয়েতনাম যুদ্ধের দামামা বেজে চলছে। পুঁজিবাদের রক্তচক্ষু আবারও হিংস্রভাবে তাকাচ্ছে সমাজের দিকে। ওই অবস্থার মধ্যেই স্বপ্ন দেখা শুরু করে একদল তরুণ। স্বপ্ন দেখে, রক্ষণশীল ভাবধারা ও কড়া নিয়মের বেড়াজালে বাঁধা শিক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে দিতে এবং ঔপনিবেশিকতার দম্ভ চূর্ণ ও সমাজে সাম্যবাদ কায়েম করতে। ষাটের দশকে ফ্রান্সে কমিউনিস্ট পার্টি ও কমিউনিস্ট শ্রমিক সংগঠন যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল। ছাত্রছাত্রীদের একটা বড় অংশ বাম সমাজতান্ত্রিক ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ হয়েছিল। ১৯৬৮ সালের মে মাসে প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা ন্যঁতে শহরে সরকার বিরোধী বিক্ষোভ শুরু করে। তাদের সঙ্গে যোগ দেয় ফরাসি শ্রমিকরাও। উত্তরাধুনিক দার্শনিকরাও ওই আন্দোলনে সমর্থন দেন। এর ফল পেতেও দেরি হয়নি। সরকারের পতন হয়। সেদিনের ছাত্র আন্দোলনের সফলতার ছায়া পড়েছিল দুনিয়াজুড়েই। তাই আজও ফ্রান্সে শ্রমিক অধিকারসহ বিভিন্ন দাবিতে ছাত্রছাত্রীরা রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করেন।