মাও জে দংয়ের পর চীন তার দেশের রাজনৈতিক নেতাদের ক্ষমতার লাগাম টেনে ধরে এবং নেতৃত্বে একক প্রভাব থেকে নিজেদের নিরাপদ দূরত্বে নিয়ে আসে। কিন্তু এখনকার চেয়ারম্যান শি জিনপিংয়ের কর্মকাণ্ডে মনে হচ্ছে, হাওয়া আবার উল্টোদিকে বইতে শুরু করেছে।
শি জিনপিং ২০১২ সালেই কেবল নেতৃত্বের একদম সামনের সারিতে চলে আসেন। চীনের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক, কেন্দ্রীয় মিলিটারি কমিশনের চেয়ারম্যান ও প্রেসিডেন্ট হন।
অবশ্য গত রবিবারেই এটি মোটামুটি পরিষ্কার হয়ে যায়, শি জিনপিংয়ের রাজনৈতিক লক্ষ্য বিরাজমান সংবিধানের বাঁধ ভেঙে দেবে। চীনের সরকারি সংবাদমাধ্যম সিনহুয়া জানায়, সাংবিধানিক সংশোধনীগুলো ওই দেশের পরবর্তী জাতীয় কংগ্রেস যাকে ছায়া সংসদ বলা হয় সেখানে উপস্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।

চীনে বিরাজমান এক ধরনের একঘেয়ে রাজনৈতিক পরিবেশে সমাজতান্ত্রিক পরিবেশকে ‘মহান’, ‘আধুনিক’ ও ‘খুব দৃষ্টিনন্দন’ বলার মধ্য দিয়ে তাদের সাংবিধানিক পরিবর্তনকে রাজনৈতিক রূপ দিয়ে লুকিয়ে ফেলছে। সিনহুয়া জানায়, চীনের প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট-এর মেয়াদকাল বিষয়ক সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা উঠিয়ে দেয়ার প্রস্তাব করেছে কেন্দ্রীয় কমিউনিস্ট পার্টি। জাতীয় কংগ্রেস হয়তো ও দাবি মেনেও নেবে। কারণ এখন পর্যন্ত চীনের কংগ্রেস ইতিহাসে এর অন্যথা হয়নি।
ওই রকমের বদলের মধ্য দিয়ে কমপক্ষে ১০ বছর পর পর ক্ষমতার যে এক ধরনের পরিবর্তন চীনে লক্ষণীয় ছিল সেটিও অবশেষে ভেঙে দিচ্ছে কমিউনিস্ট পার্টি। এমন সীমাবদ্ধ ক্ষমতা চর্চার শুরুটা করেছেন দেং জিয়াপিং যিনি ক্ষমতায় বার বার পদার্পণের যে রাস্তা চীনের জাতির পিতা মাও জে দং করেছিল সেটি রোধ করেন।
মাও জে দং এক্ষেত্রে অসীম ক্ষমতার চর্চা করতেন এবং এর ফলও ছিল ব্যাপক। তার হাত দিয়ে ‘গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড’-এর মতো প্রস্তাব হাজির হয়েছে যেটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মানবসৃষ্ট দুর্ভিক্ষের জন্ম দিয়েছে। মাও জে দংয়ের ‘সাংস্কৃতিক বিপ্লব’ও একই রকম বিপর্যয়ের জন্ম দিয়েছিল। বেইজিংয়ের সিটি কমপ্লেক্সের সদরে মাও জে দংয়ের বিরাট ছবি আজও আছে। তার শাসনের সিলসিলা মানুষের মনে এভাবে দাগ ফেলেছে যে, তার কাজের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে এক ধরনের অফিসিয়াল বক্তব্য তৈরি হয়েছে, ‘৭০ শতাংশ ভালাে এবং ৩০ শতাংশ খারাপ।’
‘সবকিছুর একক চেয়ারম্যান’
এটি এক রকম ধরেই নেয়া হয়েছিল, কেউ আর সেভাবে চীনের সাংবিধানিক ক্ষমতা কুক্ষিগত করবেন না। যেভাবে একক নেতৃত্বের প্রতি মানুষের নজর ছিল, কেউ হয়তাে সেখানে আর ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করতে পারবনে না। এসবের অবশ্যই নিয়ন্ত্রণ হবে বলে ভাবা হচ্ছিল। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এক্ষেত্রে নতুন ও আদর্শ রাজনৈতিক পরীক্ষা হিসেবে দুনিয়ায় বেশ সমাদৃত।
এখন শি ওইসবের কিছুই করছেন না। তিনি দুর্নীতি বিরোধী অভিযানের নামে তার বিরোধী পক্ষকে দমানোতে বেশ সফল হয়েছেন। এক্ষেত্রে জনসাধারণকে ব্যাপক ঘোল খাওয়ালেন। সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে নিজেকে মধ্যমণি রেখে কাজ করেন বলে যুক্তরাজ্যের মিডিয়া ইকনমিস্ট তাকে ‘সবকিছুর একক চেয়ারম্যান’ নাম দিয়েছেন।
শি যখন ক্ষমতা গ্রহণ করলেন তখন বিদ্রোহী, অ্যাক্টিভিস্ট ও নাগরিক সমাজের দৌড়ের ওপর রাখেন। আগে যেসব স্বাধীনতা ক্ষুদ্রার্থে চর্চা হতাে সেটিও থাকলো না। গত অক্টোবরে শি নিজের ‘বর্তমান যুগে সমাজতন্ত্র এবং তার চীনা বৈশিষ্ট্য বিষয়ে চিন্তা’ হাজির করেন যেটি সংবিধানে কমিউনিস্ট পার্টির সংবিধান আকারে লিপিবদ্ধ হবে। এ রকম বিরল সম্মান তার আগে কেবল চেয়ারম্যান মাও পেয়েছিলেন। এতেই বোঝা যায়, পার্টিতে শি-র প্রভাব কতটা আকাশচুম্বী।
শি জিনপিং ঘোষণা করলেন, ‘সরকার, সেনাবাহিনী, সমাজ ও বিদ্যালয়, এমনকি উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিম- সবকিছুর নেতৃত্বের ভার কমিউনিস্ট পার্টির।’ তাই তার ওই ব্যাপক ক্ষমতা এবং এর মধ্য দিয়ে নতুন পূজনীয় চরিত্র হাজির হচ্ছে।
শি জিনপিং এই দশকের সবচেয়ে ক্ষমতাধর, নাকি দশক ধরেই ক্ষমতাশীল থাকবেন?
পরিকল্পিত ওই সাংবিধানিক পরিবর্তন শি-র ক্ষমতা বাড়াবে তা নিঃসন্দেহ। পুরো পৃথিবীকে এখন চীনের সবচেয়ে ক্ষমতাশীল ব্যক্তির মুখোমুখি হতে হবে যার আগমন বার্তা বেশ জোরেশোরেই উঠেছে পুরো দশক ধরে। এসব হচ্ছে যখন চীন বৈশ্বিক কৌশলে নিজের প্রভাব বজায় রাখতে চায়। পাশ্চাত্য গণতন্ত্রের বিপরীতে নিজেদের কার্যক্রম প্রকাশ করে। সমৃদ্ধশালী ও উজ্জ্বল ভবিষ্যতের একটি ‘চীনা স্বপ্ন’ই তারা দেখে। তাদের ‘ওয়ান বেল্ট-ওয়ান রোড’ তথা একুশ শতকের সিল্ক রোড প্রজেক্ট নিতান্ত চীন ও শি-র একটি স্বপ্নই নয়, পুরো ইউরোপ-এশিয়ায় আশা জাগিয়েছে।
জার্মানির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ডয়েচে ভেলে-র সম্পাদক ম্যাথিয়াস ভন হাইন-এর মূল লেখাটি ডয়েচে ভেলের ইংরেজি ওয়েব সাইট-এ গত ২৬ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত হয়