লা লিগায় ২৬ তম রাউন্ডে আরসিডিই স্টেডিয়ামে এস্পানিয়লের আতিথ্য নিলো রিয়াল। ড্র দিয়ে শুরু করা মাসটার বাকিটা সময় যেন বুলেট ট্রেনের গতিতেই ছুটেছে জিদান বাহিনী। শেষ চার খেলার প্রত্যেকটিতেই কমপক্ষে তিনবার প্রতিপক্ষের জালে বল জড়ানো রিয়াল এ দিন মাঠে নামে সর্বশেষ ম্যাচের একাদশ থেকে পাঁচটি পরিবর্তন নিয়ে। কিন্তু এ পরীক্ষা নিরীক্ষার সমাপ্তি ঘটলো পরাজয়ের মধ্য দিয়েই। পথ খুঁজে পাওয়া রিয়াল যেন স্বেচ্ছায় সরে দাড়ালো লড়াই থেকে।
মধ্যমাঠের দুই জেনারেল বলকান জাদুকর মদ্রিচ এবং স্নাইপার ক্রুস ছাড়াও এদিন জিদান বিশ্রামে রেখেছিলেন মধ্যমাঠে রিয়ালের অন্যতম ভরসা ক্যাসেমিরোকে। ছিলেন না পর্তুগিজ রাজপুত্র রোনালদো। সুতরাং, প্রায় নতুন একটি সেটআপের রসায়ন জমতে যেমন সময় লাগার কথা ঠিক তাই হয়েছে। প্রথমার্ধে বলার মত আক্রমণ ছিলো একটিই যেটা কাজে লাগাতে পারেননি ওয়েলস উইজার্ড গ্যারেথ বেল। কারভাহালের পরিবর্তে মাঠে নামা হাকিমির ক্রসে বেল মাথা ছোঁয়ালেও তা যথেষ্ট ছিলো না সাবেক মাদ্রিদ গোলরক্ষক ডিয়াগো লোপেজকে পরাস্ত করার জন্য। এটি বাদে বাকিটা সময় পায়ে বল ধরে রাখলেও গোলের কোনো পরিষ্কার সুযোগ তৈরি করতে পারেনি মেরেঙ্গুয়েজরা। বিপরীতে পাল্টা আক্রমণকে পাথেয় মেনে মাঠে নামা কাতালান দল এস্পানিওল বেশ কবারই পরীক্ষা নিয়েছে মাদ্রিদ রক্ষণের। ম্যাচের ২৬ মিনিটে ফরাসি রক্ষণ তারকা রাফায়েল ভারানের ভূলে পাওয়া সুযোগ থেকে গোলের সহজতম সুযোগটি মিস করেন মরেনো। এখানে রিয়াল গোল রক্ষক নাভাসের কৃতিত্বও কম না, সঠিক সময়ে ঝাপিয়ে পড়ে আলতো ছোঁয়ার রক্ষা করেছেন রিয়ালকে। পরিষ্কার কর্ণারের দাবিটি যদিও উপেক্ষা করেছেন রেফারি। প্রথমার্ধেই আরো একবার এগিয়া যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলো এস্পানিওল। ৩০ মিনিটে মরেনোর শ্যুট অফসাইডের অজুহাতে বাতিল করে দেন রেফারি হোসে সানচেজ। ম্যাড়মেড়ে প্রথামার্ধ শেষ হয় গোলশূণ্য ভাবেই।
এস্পানিওলের বিপক্ষের অতীত ইতিহাস এবং দলের সাম্প্রতিক ফর্ম সম্ভবত জিদানকে আগ্রহী করে তুলেছিলো এই অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা নিরিক্ষায়। বিপরীতে এমন ভাবনাও আছে যে, যেহেতু লিগ জয়ের আশা কার্যত শেষ তাই উচল এর পরবর্তী লেগের আগে কোনো ঝুকি নিতে চাননি তিনি। এস্পানিওল, যারা এর আগে টানা বিশ ম্যাচে জয়ের মুখ দেখেনি মাদ্রিদের বিপক্ষে, এবং যার সর্বশেষ নয়টি ম্যাচই শেষ হয়েছে পরাজয়ের মধ্য দিয়ে, পরীক্ষার জন্য তাদের বেছে নেয়া হয়তো একটি দৃষ্টিকোণ থেকে ঠিকই ছিলো।
বিপত্তির শুরু দ্বিতীয়ার্ধে। মাদ্রিদের বি টিমকে পেয়ে উজ্জীবিত এস্পানিওল একের পর এক আক্রমণে ব্যতিব্যস্ত করে তোলে মাদ্রিদের রক্ষণকে। কখনো রামোস-ভারান কখনো বা নাভাসে পরিত্রাণ খুঁজেছে লস ব্লাংকোসরা। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে বদলে যাওয়া দৃশ্যপটই শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠে ফল নির্ধারক। এস্পানিওল যখন গতি আর দুর্দান্ত পাসের পসরা সাজিয়ে মুগ্ধ করেছে বোদ্ধাদের, সেখানে মাদ্রিদকে চিনতে হয়েছে শুধুই জার্সি দেখে। বেশ কবার বেঁচে গেলেও এস্পানিওলের অব্যাহত প্রচেষ্টায় শেষ পর্যন্ত হার মানতে বাধ্য হয় মাদ্রিদ। নির্ধারিত সময়ের শেষে যোগ করা মিনিটের শেষ মুহুর্তে কাতালান দলটিকে আনন্দে ভাসিয়ে মাদ্রিদকে স্তব্ধ করে দেন মরেনো। গার্সিয়ার বাড়ানো অসাধারণ বলটিতে নেয়া মরেনোর শ্যুটের কোনো জবাব ছিলো না নাভাসের কাছে। একই সাথে প্রশংসা প্রাপ্য এস্পানিওলের দুই রক্ষণ তারকা ডেভিড লোপেজ এবং অ্যারন ক্যারিকোলের।
ম্যাচে পাঁচটি পরিবর্তনই যে মাদ্রিদের হারের প্রধাণ কারণ এমনটা বলা কঠিন। কারণ, পুরো ম্যাচে মার্কোস লরেন্তে এবং আশরাফ হাকিমির নৈপুণ্য যথেষ্ট ভালোই ছিলো। মাদ্রিদকে ডুবিয়েছে পরবর্তী ম্যাচে নিজের অবস্থান পাকা করার অভিপ্রায়ে মধ্যমাঠের খেলোয়াড়দের ইন্ডিভিজুয়াল মুভ। গত ম্যাচেই মুগ্ধ করা লুকাস এদিন ভুগেছেন সঙ্গীর অভাবে। লোন স্ট্রাইকার রুপে সম্পুর্ণ ব্যর্থ বেল। ইস্কো যতটুকু চেষ্টা করেছেন তা যথেষ্ট ছিলো না জিদানের মুখে হাঁসি ফোটাবার জন্য। দ্বিতীয়ার্ধে মাঠে নামা বেনজেমা, সেবেওয়স বা মায়োরাল তো সে অর্থে বলই পাননি কিছু করার জন্য। মোদ্দা কথা যে রসায়নের অনুপম নৈপুণ্যে আলাভেসকে বিধ্বস্ত করে মাঠ ছেড়েছিলো রিয়াল এদিন তার ছিটে ফোটাও দেখা যায়নি। প্রত্যেককেই মনে হয়েছে একটি বিচ্ছিন্ন দীপ। ভুল পাস, বোঝাপড়ার অভাবগুলো ছিলো বেশ স্পষ্ট। হ্যা, লিগের আশা আগেই শেষ হয়ে যাওয়ায় এ পরাজয় লিগ টেবিলে হয়তো তেমন প্রভাব ফেলবে না, তবে উড়তে থাকা জিদান মাটিতে নেমে এসে এটুকু অনুধাবন করলেন যে, মূল খেলোয়াড়দের বাইরে বেঞ্চের ওপর ভরসা করে এ মৌসুমে অন্তত পার পাওয়া যাবে না।
এ ম্যাচ থেকে ইতিবাচকভাবে নেয়ার মতো তেমন কিছুই নেই রিয়ালের। বরং জিদান খেলোয়াড়দের মাঝে এই অনুধাবনটা জাগ্রত করতে পারেন যে, দিন শেষে ফুটবল একটা দলীয় খেলাই। একক কিছু ঝলক কমবেশি সবার পায়েই দেখা গেলেও তা ফল তো অনুকুলে আনেইনি বরং এমন একটি দলের বিপক্ষে পরাজয় এনে দিয়েছে যাদের বিপক্ষে রিয়ালের শেষ হারের স্মৃতি স্বরণে আনতে গেলে সাহায্য নিতে হচ্ছে ইতিহাসের পাতার। ম্যাচটা এস্পানিওল জিতলেও ম্যাচ সেরা ছিলেন মাতেও কোভাচিচ। পুরো মাঠ দাবড়ে বেড়ালেও কোনো কাজে আসেনি তার নৈপুণ্য। আবারো, ওই একই কথা বলতে হচ্ছে, একক নৈপুণ্য হয়তো অনেক সময় মুগ্ধকর মুহুর্তের জন্ম দেয়, কিন্তু ম্যাচ জেতায় না।
ড্র দিয়ে শুরু করা মাসটার শেষ হলো পরাজয় দিয়ে। মাঝে পাঁচ ম্যাচের উড়ন্ত সময়। জিদানসহ পুরো মাদ্রিদ দলই এস্পানিওল থেকেই এ শিক্ষাটা নিতে পারে যে, জিততে হলে সবার সমান অবদান লাগে। মৌসুমজুড়েই চড়াই-উৎরাই পার করা মাদ্রিদ যত দ্রুত এটি অনুধাবন করবে ততই মঙ্গল। ৩-১ এ এগিয়ে থাকায় পিএসজি বাঁধা হয়তো পার করা কঠিন হবে না, তবে এ অনুধাবনে ঘাটতি থাকলে মৌসুমের শেষটা যে অমানিশা আবৃত হবে তা নিশ্চিত করেই বলা যায়।