রাজ্জাক-তামিমের সাথে কী হচ্ছে

রাজ্জাক-তামিমের সাথে কী হচ্ছে

বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের গণমাধ্যমগুলোতে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের শীর্ষ কর্তাদের খামখেয়ালী আচরণ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। বিশেষ করে, ক্রিকেটারদের সাথে আচরণের বিষয়ে গণমাধ্যমের সে সমালোচনা বা সমর্থকদের হতাশা, কোনোটাই যেন স্পর্শ করে না বিসিবিকে। সিনিয়র দুই খেলোয়াড়ের সাথে আচরণে অন্তত এমনটাই ভাবনা সাধারণ দর্শকদের।

চলতি বছরের প্রথম সপ্তাহেই দেশসেরা ওপেনার তামিম ইকবাল পাঁচ লক্ষ টাকা জরিমানা গুণেছেন পিচ, আউটফিল্ড এবং কিউরেটরকে নিয়ে করা মন্তব্যের জের ধরে। এ জরিমানার আগে তিনি শোকজের মুখোমুখি হয়েছেন এবং সেখানে গণমাধ্যমের সামনে করা নিজের মন্তব্যের জন্য দুঃখও প্রকাশ করেছেন। তাতেও সন্তষ্ট না হয়ে বিসিবি উল্টো তামিমকে জরিমানা করেছে এবং রক্ষা করেছে অভিযুক্ত লংকান কিউরেটর গামিনি ডি সিলভাকে। মজার বিষয় হচ্ছে, সদ্য সমাপ্ত ত্রিদেশীয় সিরিজ শেষে সেই গামিনি ডি সিলভার বিপক্ষেই অভিযোগের আঙ্গুল তুলেছেন বোর্ডের অনেকে। অভিযোগ গুরুতর; বাংলাদেশের চাহিদা মতন পিচ না বানিয়ে নিজস্ব খেয়ালের পিচ তিনি তৈরী করেছেন এবং পিচের আচরণ কেমন হবে সে তথ্য লংকান কোচ হাথুরুসিংহয়ের কাছে পাচার করেছেন। অভিযোগটি যেহেতু এখনো প্রমাণিত নয় তাই সে বিষয়ে কোনো মন্তব্য নেই, যে বিষয়টি দেখার মত সেটি হলো গামিনির বিপক্ষে করা তামিমের অভিযোগ আমলে না নেয়া, এবং যারা সেটি আমলে নেননি তাদেরই গামিনির বিষোদগার করা। আশ্চর্য বিষয় বটে। এখানে আরো একটি বিষয় উল্লেখ্য যে, বোর্ড কর্তা এবং ম্যানেজমেন্টের করা অভিযোগের ভিত্তিতে গামিনিকে কারণ দর্শাতে বলা হয়েছে। এখানে আমরা যা দেখতে পাচ্ছি তা হলো, অনুপোযুক্ত পিচ তৈরীর অভিযোগ কোনো খেলোয়াড় করলে তার ওপর নেমে আসছে জরিমানার খড়্গ আর একই অভিযোগ কর্তারা করলে সেটি আমলে নিয়ে অভিযুক্তের বিপক্ষে পাঠানো হচ্ছে কারণ দর্শানোর নোটিস। এ বিষয়ে সাথে প্রাসঙ্গিক দুটি ঘটনা উল্লেখ করে যাবো পরের প্রসঙ্গে।

একই মাসের মাঝামাঝি সময়ে পিচ নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন অজি অধিনায়ক স্টিভ স্মিথ। তার সে মন্তব্যের জন্য জরিমানা তো দূর কারণ পর্যন্ত দর্শাতে হয়নি। উপরন্তু অজি বোর্ডের নির্বাহী কর্মকর্তা স্মিথের মন্তব্যকে বেশ গুরুত্বের সাথে নিয়ে সমস্যা সমাধানের পথ খোজার কথা বলেছেন। উল্লেখ্য যে, গণমাধ্যমের সামনে করা স্মিথের সে মন্তব্যের পরে যে মাঠের পিচকে নিয়ে তার অভিযোগ সেটির পাশে বসেছে ডিমেরিট পয়েন্ট।

সর্বশেষ ঘটনাটি মাত্র কিছুদিন আগের। ভারত-আফ্রিকা শেষ টেস্ট শেষে আফ্রিকান ওপেনার এলগার পিচকে উল্লেখ করেছেন ভয়াবহ হিসাবে। এরপরে তিনি যে সব কথা বলেছেন তার বিপরীতে জরিমানা গোণা তামিমের বয়ান যদি শুনে থাকেন তাহলে এলগারকে আপনার ক্রিমিনাল মনে হতে বাধ্য। অথচ, এমন মন্তব্যের পরেও এলগার বহাল তবিয়তেই আছেন, এবং তাকেও স্মিথের মতো কোনো শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়নি। সর্বশেষ খবরানুযায়ী এলগারের সে মন্তব্যের পর আইসিসিও পিচকে বাজে উল্লেখ করে মাঠের নামের পাশে বসিয়ে দিয়েছে ডিমেরিট পয়েন্ট।

তামিমের জরিমানা যৌক্তিকতা সম্পর্কে বোর্ড প্রধান বলেছিলেন যে, তামিমের মন্তব্য ভয়াবহ, ইতোমধ্যেই মিরপুর স্টেডিয়ামের নামের পাশে ডিমেরিট পয়েন্ট থাকায় তার এ মন্তব্য আইসিসিকে প্রভান্বিত করতে পারে আরো ডিমেরিট পয়েন্ট যোগ করার ক্ষেত্রে, যেটি হলে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা নেমে আসবে হোম অফ ক্রিকেটের ওপর। বাস্তবতা হচ্ছে ঘরোয়া লিগের একটি ম্যাচকে নিয়ে করা তামিমের সে মন্তব্য আইসিসি আমলেও নেয়নি এবং শেরে বাংলা স্টেডিয়ামের নামের পাশে কোনো ডি মেরিট পয়েন্টও বসেনি। কল্পনা-প্রসূত একটি চিন্তা থেকে তামিম যেখানে জরিমানার মুখোমুখি হলেন সেখানে যাদের মন্তব্যের পর বাস্তবেই মাঠের নামের পাশে ডিমেরিট পয়েন্ট যোগ হলো তারা রইলেন নিশ্চিন্তে ! বাহবাটা ঠিক কার প্রাপ্য সেটি পাঠকরাই ঠিক করুন।

এবার আসুন চলতি প্রসঙ্গে। চলমান টেস্ট সিরিজের জন্য বহুদিন পরে জাতীয় দলে ডাক পেয়েছেন প্রথম বাংলাদেশি হিসাবে প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে পাঁচশ উইকেট পাওয়া আব্দুর রাজ্জাক। ঘরোয়া আসরে তার ধারাবাহিক নৈপুণ্য এবং বোলিং লাইন-আপের অনভিজ্ঞতার কারণে রাজ্জাকের ডাক পাওয়া ইতিবাচক হিসাবেই দেখেছিলো ক্রিকেট বিশ্লেষকরা। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে রাজ্জাককে ছাড়াই প্রথম টেস্ট খেলতে নামলো বাংলাদেশ। রাজ্জাককে একাদশের বাইরের রাখার ক্ষেত্রে যে যুক্তিটা বিসিবি পরিচালক, জাতীয় দলের ম্যানেজার এবং টেকনিক্যাল ডিরেক্টরের দায়িত্বে থাকা খালেদ মাহমুদ দিয়েছেন তা গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি কারো কাছেই। তার কথার সারমর্ম হচ্ছে, রাজ্জাকের অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন না থাকলেও যেহেতু তিনি দীর্ঘদিন সেট-আপের বাইরে, এবং সানজামুল সেটাপের মধ্যে ছিলেন তাই সানজামুলকেই খেলানো হয়েছে। আরো যোগ করে বলেন, দলের সবাই মিলে বসে নাকি মনে হয়েছে রাজ্জাকের আরো একটু সময় দরকার! আরেকটু কাজ করলে তার জন্য সহজ হবে! আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ১৪ বছরের অভিজ্ঞতা যার, তাকে কোন হিসাবে উপযুক্ত মনে হয়নি সেটি একটি প্রশ্ন। একই সাথে এই প্রশ্নটাও উঠে আসে যে, তিনি যদি উপযুক্ত নাই হবেন তাহলে তাকে দলে ডাকা হলো কেন? প্রশ্নটি ব্যাখ্যার দাবী রাখে এই কারণে যে, ক্রিকেটে অলিখিত কিছু নিয়ম আছে। এরকম সিনিয়র একজন ক্রিকেটার বুবি গায়ে মাঠের বাইরে বসে আছেন, পানি পানের বিরতিতে মাঠে প্রবেশ করছেন; বিষয়টি খুবই দৃষ্টিকটূ। আপনি বলতে পারেন পারফরম্যান্সই সব কিছুর মাপকাঠি। কথাটা সত্য, কিন্তু এ সত্য যুক্তিতে টিকবে না এই জন্য যে, এই সিরিজে তিনি পারফর্ম করার সুযোগই পাননি। নেহায়েত পানি টানার জন্য এরকম সিনিয়র একজনকে ডেকে আনা ক্রিকেটারদের জন্যই অবমাননাকর। একই দৃশ্য আমরা দেখেছিলাম সাবেক অধিনায়ক মোহাম্মদ আশরাফুলের বেলায়ও। জাতীয় দলের সাবেক একজন অধিনায়ক পানির বোতল হাতে মাঠে ঢুকছেন; এমন অস্বস্তিকর দৃশ্য এর আগে কেউ দেখেছেন বলে মনে হয় না।

পুরো বিষয়টাই বিস্ময়কর ঠেকেছে অনেক বোদ্ধার কাছেই। আরো মজার বিষয় হলো; উপমহাদেশের দলগুলো সহজাতভাবেই স্পিনের বিপক্ষে দারুন। তাদের বিপক্ষে যখন আপনি তিন স্পিনার নিয়ে খেলবেন, সেটি এমনিতেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়। ব্যাপারটা আরো জটিল আকার ধারণ করে যখন প্রতিপক্ষ দলের কোচ হন মাত্রই বাংলাদেশের দায়িত্ব ছেড়ে লংকানদের দায়িত্ব নেয়া হাথুরুসিংহয়ে। মিরাজ, তাইজুলদের শক্তির জায়গা বলুন কিংবা দুর্বলতা সবই হাথুরুর মুখস্ত। এমন প্রতিপক্ষের বিপক্ষে যখন আপনি তিন স্পিনার নিয়ে খেলবেন তখন আপনি আনকোরা কারো বদলে অভিজ্ঞ কারোই ওপর ভরসা রাখবেন, এটাই স্বাভাবিক হবার কথা। অথচ ক্রিকেটে অভিজ্ঞতার যে আলাদা একটি মূল্য আছে সেটি দেখিয়েছেন রঙ্গনা হেরাথ। পুরো ম্যাচেই সবাই যখন টার্ন-বাউন্সের জন্য মাথা কুটে মরেছেন সেখানে হেরাথকে দেখা গিয়েছে দারুন টার্ন আদায় করে নিতে। স্বাভাবিকের ব্যত্যয় ঘটিয়ে অস্বাভাবিক কিছু ঘটানোর চিন্তাটা যে কোনো কাজেই আসেনি তা তো দিবালোকের মত স্পষ্ট। আমি সানজামুলের সমালোচনা করছি না, যা ঘটেছে তার পিছনে তার দায় নেই, দায় পুরোটাই টিম ম্যানেজম্যান্টের।

আয়ের হিসাবে বিসিবি এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে স্বচ্ছল ক্রীড়া বোর্ড। এই স্বচ্ছলতাটা এনে দেয়ার পিছনে সিংহভাগ অবদানই কিন্তু ক্রিকেটারদের। বিশ্বকাপ থেকে বা চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি থেকে পাওয়া বিশাল অংকের প্রাইজমানি বলুন কিংবা মোটা অংকের সম্প্রচার সত্ত্ব সবকিছুর পিছনেই কিন্তু মূখ্য ভুমিকা ক্রিকেটারদের। খেলোয়াড়দের সাথে তাই আচরণের বিষয়টিতে অন্তত বোর্ডের সতর্ক হওয়া উচিত। রাজ্জাকের বা তামিমের সাথে এই আচরণের বিরুদ্ধে ক্রিকেটারদের কেউ হয়তো প্রকাশ্যে কিছু বলতে পারবেন না, কারণ কোড অফ কন্ডাক্ট নামক মুখ বন্ধ করার আইনিসিদ্ধ প্রক্রিয়ায় তারা আটকা। কিন্তু, সিনিয়র কারো সাথে এমন আচরণ যে ভিতরে ক্ষোভের সৃষ্টি করবে না তার কোনো নিশ্চয়তা তো নেই।

ক্রিকেটাররা দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন, তাই তাদের প্রাপ্য সম্মান দিতে কসুর করা বোধ করি সঠিক কোনো দৃষ্টান্ত হবে না। বোর্ডের নিকট তাই আর্জি থাকবে এইটুকু অনুধাবন করার যে, ক্রিকেটারদের হেনস্তা করা কোনো কৃতিত্বের কাজ নয়, বরং এটি সকলের সামনে বোর্ডের ইমেজকেই ক্ষতিগ্রস্থ করে।