১৯৫৮ সালের ৬ ফেব্রুয়ারী,পশ্চিম জার্মানির মিউনিখ রেইম বিমানবন্দর। টেক অফের জন্য তৃতীয়বারের মতো প্রস্তুতি নিচ্ছে ব্রিটিশ ইউরোপিয়ান এয়ারওয়েজের বিমান ‘লর্ড বার্গলি’। তখনো কেউ অনুমান করতে পারেনি পাইলট জেমস থাইন এর গোয়ার্তুমির ফলাফল এ তৃতীয় টেক-অফের প্রচেষ্টা ফুটবল জগতে নামিয়ে আনবে শোকের ছায়া।
তার এ ব্যর্থ টেক অফের খেসারত দিয়ে বিদ্ধস্ত হয় বিমানটি, যাতে যাত্রী হিসেবে ছিলো ইউনাইটেড কিংবদন্তি স্যর ম্যাট বাসবি এবং তার শিষ্যরা। যে দলটি ‘বাসবিস বেবি’ নামে পরিচিত ছিলো। সে ঘটনায় প্রাণ হারায় ইউনাইটেডের ফুটবলার,ক্লাব কর্মকর্তা, সাংবাদিক সহ মোট ২৩ জন। ইউনাইটেড খেলোয়ারদের মধ্যে ছিলেন রবার্ট ব্রুনি, মার্ক জোনস, ডানকান এডওয়ার্ডস, টমি টেইলর, এডি কোলম্যান, লিয়াম হুইলান, ডেভিড প্রেগ এবং জিওফ বেন্ট। স্যার বাসবি সে দুর্ঘটনায় প্রাণে বাচলেও মানসিক ভাবে প্রচন্ড ভেঙ্গে পড়েন এবং ফুটবল থেকে গুটিয়ে নেন নিজেকে। পরে স্ত্রীর ইচ্ছাতেই আবারো ফুটবলে ফিরেন তিনি। আজকের যে ইউনাইটেড আমরা দেখি তার ভিত্তিটি স্যার বাসবির হাতেই গড়া। মিউনিখের এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ফুটবল জগতে ‘মিউনিখ ট্রাজিডি’ নামেই পরিচিত।

উপরের ঘটনাটি অনেকের জানা। আজকে আমি একটু নজর দেবো এ ঘটনার পরবর্তী অধ্যায়ের দিকে। যেখানে দেখবো কিভাবে সে সময় ইউনাইটেডের পাশে এসে দাড়িয়েছিলো তাদের চিরপ্রতিদ্বন্দী লিভারপুল এবং স্প্যানিশ জায়ান্ট রিয়াল মাদ্রিদ। যখন এ দুর্ঘটনাটি ঘটে তখন মাদ্রিদ প্রেসিডেন্ট ছিলেন সান্তিয়াগো বার্নাব্যু। এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় প্রচন্ড আঘাত পান তিনি। ইউনাইটেডের পাশে দাড়ানোর পদক্ষেপ হিসেবে মাদ্রিদ সে বছরের ইউরোপিয়ান কাপ ইউনাইটেডকে দেয়ার আহ্বান জানায়। ইউনাইউটেড এভাবে ট্রফি নিতে অস্বীকৃতি জানালে মাদ্রিদ তাদের শিরোপা ‘বাসবিস বেবি’দের নামে উৎসর্গ করে। পরবর্তীতে মাদ্রিদ ইউনাইটেড খেলোয়ারদের ছুটিতে তে মাদ্রিদ ভ্রমনের আহ্বান জানায়, যাতে ইউনাইউটেড খেলোয়াররা মেন্টাল ট্রমা থেকে মুক্তি পায়। এবং তারা ইউনাইটেডকে আর্থিক সমর্থন দেয়ার উদ্দেশ্যে তাদের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ খেলে অর্থ সংগ্রহে সাহায্য করে। মাদ্রিদ দর্শক আকর্ষনের জন্য এবং ইউনাইটেড খেলোয়ারদের মানসিক সমর্থন দেবার উদ্দেশ্যে পূর্ন শক্তির দল নিয়েই মাঠে নামে। তারা পুসকাসকে ইউনাইটেডের কাছে অফার করে। এবং ডি স্টিফানোকেও পুরো মৌসুমের জন্য অফার করে। কিন্তু, এফএ র কিছু নিয়মের জ্বালে আটকা পড়ে ইউনাইটেড তাদের দলভুক্ত করতে ব্যর্থ হয়।

লিভারপুলের কিংবদন্তি বিল শ্যঙ্কলি ও ইউনাইটেডের এ দুর্ঘটনায় প্রচন্ড আঘাত পান। তিনি ইউনাইটেডকে লিভারপুলের মূল দল থেকে পাচ জন খেলোয়ার বেছে নিতে বলেন, এবং লিভারপুলই তাদের বেতন দেবে বলে জানান। তিনি তাদের রিজার্ভ টিমটিকেও ইউনাইটেডকে নেয়ার জন্য অনুরোধ করেন। এবং অন্য যেকোনো ধরনের সাহায্যও তারা করতে প্রস্তুত বলে জানান। লিভারপুল বাদে নটিংহাম ফরেস্টও সাহায্য করার আগ্রহ দেখায়। স্প্যানিশ দল হিসেবে রিয়ালের ইউনাইটেডকে সাহায্য করতে চাওয়াটা যতটা বিস্ময়কর তার চেয়ে বহুগুন বেশী লিভারপুলেরটা। কেননা তাদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দিতার সম্পর্ক ছিলো। এ বিষয়ে শ্যঙ্কলি বলেন ” লিভারপুল ও ইউনাইটেডের মধ্যে প্রতিদ্বন্দীতা থাকলেও কোনো ঘৃণাবোধ ছিলো না।”
ইউনাইটেড ভক্তগন এর আগে আহ্বান জানিয়েছেন, ইউনাইটেড কে সংক্ষেপে “ম্যান ইউ” না ডাকার জন্য। এটি দ্বারা সেদিনের দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো খেলোয়ারদের প্রতি চরম অশ্রদ্ধা প্রদর্শন করা হয়।
এর বিপরীত উদাহারন ও রয়েছে। লিভারপুলেরই কিছু বর্বর সমর্থকরা এ ঘটনায় নিহত খেলোয়ারদের ব্যঙ্গ করে “ম্যান ইউ” শিরোনামের একটি গান বাধে। যেটি পশুত্বের পরিচয় বহন করে। এ গানে তাদের সমর্থন দেয় আরো কয়েকটি ক্লাবের সমর্থকরা, যদিও এরা ক্লাবের অবস্থানের কারনে নিজেদের গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়।
দুটি আলাদা নজির উল্লেখ করার কারণ, লিভারপুলের সমর্থকরা নিজেদের অবস্থান বদলাতে বাধ্য হয়েছিলো ক্লাবের শক্ত অবস্থানের কারণে। মাদ্রিদের পাশে দাড়ানোর ব্যাপারটাও মনে রাখার মতো। এখানে যে বিষয়টি উল্লেখ করার মত সেটি হলো বৈরী হলেও দুঃসময়ে পাশে দাড়ানোর চমৎকার একটি নজির গড়েছিলো মাদ্রিদ এবং লিভারপুল। অথচ আমরাদের অনেকেই ইউনাইটেডকে “ম্যান ইউ” নামে ডাকি, এমনকি বাংলাদেশের গণমাধ্যমগুলোতেও এ রেওয়াজ দেখা যায়। বিষয়টি অনিচ্ছাকৃত বা অজ্ঞতাবশত; যে কারনেই হোক সেদিন এর ঘটনায় শহীদদের আহত করে। আহত করে ইউনাইটেড সমর্থকদের। অনেক ইউনাইটেড ভক্তগন এর আগে আহ্বান জানিয়েছেন, ইউনাইটেড কে সংক্ষেপে “ম্যান ইউ” না ডাকার জন্য। এটি দ্বারা সেদিনের দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো খেলোয়াড়দের প্রতি চরম অশ্রদ্ধা প্রদর্শন করা হয়।
৬ ফেব্রুয়ারী ৬০ বছর পূর্তি হবে সেদিনের সে দিন মর্মান্তিক দুর্ঘটনার। নিজেদের সর্বশেষ ম্যাচে এক মিনিট নীরবতা পালনের মধ্য দিয়ে ইউনাইটেড স্মরণ করে তাদের অকাল প্রয়াত প্রিয় মুখগুলোর। মূল ঘটনার সাথে মাদ্রিদ এবং লিভারপুলের ঘটনাটা উল্লেখ করলাম এই কারণে যে, প্রতিদ্বন্দী হয়েও যেখানে প্রতিপক্ষের দুঃখে সমব্যাথী তারা সেখানে আমাদের সামান্য অসতর্কতা অজান্তেই কষ্ট দেয় দলটির সমর্থকদের। তাই, কষ্ট করে একটু বেশী সময় নিয়ে লিখতে হলেও অনুরোধ থাকবে ম্যান ইউ না বলার জন্য।