দ্বিতীয় দিনের হিরো মাহমুদুল্লাহ

দ্বিতীয় দিনের হিরো মাহমুদুল্লাহ

বাংলাদেশ-শ্রীলংকা রকেট টেস্ট সিরিজ
প্রথম টেস্ট, দ্বিতীয় দিন
জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়াম, চট্টগ্রাম

• টেস্টে সপ্তমবারের মতাে এক ইনিংসে ৫০০ বা এর চেয়ে বেশি রান করলো বাংলাদেশ
• ‎সপ্তম বাংলাদেশি ব্যাটসম্যান হিসেবে ২ হাজার রানের ল্যান্ডমার্ক স্পর্শ করলেন মাহমুদুল্লাহ
• ‎ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় সেঞ্চুরি করে অপরাজিত ধনানজয়া
• ‎দিন শেষে স্কোর : বাংলাদেশ ৫১৩, শ্রীলংকা ১৮৩/১
• ‎দিন শেষে শ্রীলংকা পিছিয়ে ৩২৬ রানে

প্রথম সেশন

বড় কিছুর স্বপ্ন নিয়ে দিন শুরু করা বাংলাদেশ পথ হারায় প্রথম সেশনেই। প্রথম দিন শেষে ১৭৫ রানে অপরাজিত থাকা মুমিনুল ফিরে যান আগের দিনের রানের সঙ্গে মাত্র এক রান যোগ করেই। রঙ্গনা হেরাথের নিরীহ দর্শন একটি বলে টাইমিংয়ে গড়বড় করে শট লেগে দাঁড়ানো মেন্ডিস-এর চমৎকার একটি ক্যাচে পরিণত হওয়ার মধ্য দিয়ে শেষ হয় মুমিনুলের ১৭৬ রানের অসাধারণ ইনিংসটি। কুয়াশায় ঢাকা চট্টগ্রামের আকাশের মতােই বাংলাদেশ দলের বড় ইনিংসের স্বপ্নটাও ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিল যখন হেরাথ-এর বুদ্ধিদীপ্ত ফাঁদে পা দিয়ে মোসাদ্দেক নিজের উইকেটটি উপহার দিয়ে আসেন লংকানদের। প্রথম দিনে হতাশ করা হেরাথই যেন হয়ে উঠছিলেন লংকানদের নায়ক। কিন্তু সেশনের বাকিটা সময় আর কাজে আসেনি হেরাথ জুজু। মেহেদী মিরাজকে নিয়ে ছোট্ট কিন্তু কার্যকর একটি জুটি গড়েন অধিনায়ক রিয়াদ। রান আউটের ফাঁদে পড়ে মিরাজের বিদায়ে বাংলাদেশের স্বপ্ন পরিণত হয় শঙ্কায়। কিন্তু তখনই রুখে দাঁড়ান বাংলাদেশের আনসাং হিরো মাহমুদুল্লাহ। লেজের ব্যাটম্যানদের নিয়ে বহুবার বাংলাদেশকে কক্ষপথে ফেরানো মাহমুদুল্লাহর কাছে এদিন প্রত্যাশা ছিল অনেক। একে তো দলের অন্যতম মূল খেলোয়াড়, অন্যদিকে এ ম্যাচে সামলাচ্ছেন অধিনায়কের দায়িত্ব। বিসম চাপে মাহমুদুল্লাহ কতটা কী করতে পারেন সেটিই ছিল দেখার বিষয়। তাকে আরো চাপে ফেলতে লংকান দলপতি চান্দিমাল একপ্রান্ত থেকে ব্যবহার করে যাচ্ছিলেন হেরাথ-কে। এর পেছনে শুধু হেরাথরে সকালে পাওয়া দুই উইকেটই নয়, অন্যতম প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে মাহমুদুল্লার বিপক্ষে তার অতীতের সাফল্য। এর আগে পাঁচবার হেরাথের মুখোমুখি হয়ে চারবারই হার মেনেছিলেন মাহমুদুল্লাহ- ৩৩ বল মোকাবেলা করে করতে পেরেছিলেন সর্বসাকুল্যে পাঁচ রান। কিন্তু এ সেশনে অন্তত ওই জুজু কোনো কাজে আসেনি, বরং দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ে অভিষিক্ত সানজামুলকে সঙ্গে নিয়ে বেশ স্বস্তিদায়ক একটি অবস্থানে থেকেই সেশনটি পার করেছেন টাইগার দলপতি। একেবারে যে খোলসে ঢুকে খেলেননি এর প্রমাণ পেরেরা-কে মারা চমৎকার ছক্কাটি। দু’জনের অবিচ্ছিন্ন ৫০ রানের জুটিতে ৪৫০ পার করেই লাঞ্চে গেছে বাংলাদেশ। রিয়াদকে যোগ্য সঙ্গ দিয়েছেন সানজামুলও। একটি চারের সাহায্যে ৫২ বলে ২৩ করে অপরাজিত থেকে সেশন করেছেন তিনি। দিনের শুরুটা যেভাবে হয়েছিল এতে সেশনের নায়ক বলা যেত হেরাথকেই। কিন্তু তার নায়ক হওয়র পথে বাধার দেয়াল দাঁড় করিয়ে যেভাবে বাংলাদেশকে ম্যাচে ফিরিয়েছেন রিয়াদ সেভাবেই সেশন হিরোর তকমাটা তার সঙ্গে বেশি মানানসই। প্রথম সেশন শেষে একটি বিষয় স্পষ্ট, সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পিচ থেকে স্পিনাররা বেশ ভালো সুবিধাই পাবেন। তাই বোর্ডে ৫০০-৫৫০ রান জমা করতে পারলে ভালো কিছুর আশা করতেই পারে বাংলাদেশ।

প্রথম সেশন শেষে স্কোর : বাংলাদেশ ৪৬৭/৭
সেশন হিরো : মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ

দ্বিতীয় সেশন

প্রথম সেশনের ভূত যেন দ্বিতীয় সেশনেও তাড়া করেছিল বাংলাদেশকে। সেশনের শুরুতেই নেই সানজামুল। সান্দাকান-এর বলে লাইন মিস করে স্ট্যাম্পিংয়ের শিকার হওয়ার আগে তিনি করেন ২৪ রান। সানজামুলের পর ক্রিজে আসা তাইজুলও বিদায় নেন দ্রুত। হেরাথের চমৎকার একটি ডেলিভারিতে বোল্ড হন তাইজুল। দশ নাম্বারে নামা কোনো ব্যাটসম্যানের পক্ষে ওই ডেলিভারির উপযুক্ত জবাব দেয়াটাও প্রায় অসম্ভব। পাচশ’র ম্যাজিক ফিগার যখন শুধু কল্পনা মনে হতে শুরু করেছে তখনই আবার মাহমুদুল্লাহ ম্যাজিক। শেষ ব্যাটসম্যান মোস্তাফিজকে নিয়ে গড়লেন ৩৫ রানের জুটি। আর ওই জুটিতেই ৫০০ রানের ল্যান্ডমার্ক পার হয় বাংলাদেশ। পুরোটা সময় একপ্রান্ত ধরে রাখা মাহমুদুল্লাহ অপরাজিতভাবে মাঠ ছেড়েছেন সেঞ্চুরি না পাওয়ার আক্ষেপ নিয়েই। তবে এ জুটিতে মোস্তাফিজেরও রয়েছে চমৎকার অবদান। মাটি আঁকড়ে পড়ে থেকে রিয়াদকে দিয়েছেন যোগ্য সঙ্গ। হেরাথকে লং অন দিয়ে মারা তার ছক্কাটিকে ম্যাচের অন্যতম সেরা মুহূর্ত হিসেবে আখ্যা দেয়া যায়। স্পিনাররা মাথা কুটে মরায় শেষ পর্যন্ত লকমল-এর শরণাপন্ন হতে বাধ্য হন চান্দিমাল। মাত্র দুই বলেই কাঙ্ক্ষিত উইকেটটি এনে দিয়ে বাংলাদেশের ইনিংসটির লেজ মুড়ে দেন লকমল। ইনিংসে লংকানদের সেরা বোলারও তিনি। ৮৩ রানে অপরাজিত থাকা মাহমুদুল্লাহ সপ্তম বাংলাদেশি হিসেবে ছুঁয়েছেন ২ হাজার রানের ল্যান্ডমার্ক। ৫১৩ রানের পাহাড় সামনে রেখে ব্যাটিংয়ে নেমে শুরুতেই উইকেট খোয়ান লংকানরা। আসলে বলা উচিত খোয়াতে বাধ্য হয়। দ্বিতীয় ওভারে সানজামুলকে টার্ন পেতে দেখে এরপরের ওভারেই মোস্তাফিজের বদলে মিরাজের হাতে বল তুলে দেন মাহমুদুল্লাহ। আর তার ওই মাস্টার স্ট্রোকেই বোর্ডে কোনো রান যোগ হওয়র আগেই উইকেট হারায় শ্রীলংকা। করুনারত্ন-এর প্রতি বিন্দুমাত্র করুণা প্রদর্শন না করে স্লিপে তাকে ইমরুলের ক্যাচে পরিণত করেন মিরাজ। এরপর পাল্টা আক্রমণেই পথ খোঁজার চেষ্টা করেন ধনানজয়া। তার ও মেন্ডিসের পাল্টা আক্রমণের কৌশল নস্যাতে ফের মোস্তাফিজকে আক্রমণে আনেন রিয়াদ। এ সিদ্ধান্তের সুফলটিও হাতেনাতেই পেয়ে যাচ্ছিল বাংলাদেশ। কিন্তু মিরাজ-ইমরুলের দ্বিধায় স্লিপে ক্যাচ দিয়েও বেঁচে যাওয়া মেন্ডিস, ধনানজয়া-কে নিয়ে সেশনটি শেষ করেছেন আর কোনো বিপদ হতে না দিয়েই। চেপে ধরা বাংলাদেশি বোলারদের ওপর চওড়া হয়ে গলার ফাঁসটা আলগা করার স্বস্তি নিয়েই সেশনটি শেষ করেছেন ওই দুই ব্যাটসম্যান। চা-পানের বিরতিতে যাওয়ার আগে মেন্ডিস ও ধনানজয়া অপরাজিত ছিলেন যথাক্রমে ১৩ ও ৩৭ রানে।

দ্বিতীয় সেশন শেষে স্কোর : বাংলাদেশ ৫১৩, শ্রীলংকা ৫০/১
সেশন হিরো : মাহমুদুল্লাহ

তৃতীয় সেশন

চট্টগ্রাম টেস্টের প্রথম দু’দিনের চারটি সেশন বাংলাদেশ রাজত্ব করলেও দ্বিতীয় দিনের শেষ সেশনটি শুধুই শ্রীলংকার। আরো স্পষ্ট করে বললে ধনানজয়া ও মেন্ডিসের। দিনের দ্বিতীয় সেশনটিতে সমানে সমান লড়াই হলেও তৃতীয় সেশনের পুরোটা সময়ই বাংলাদেশের বোলার ওপর ছড়ি ঘুড়িয়েছেন ওই দুই ব্যাটসম্যান। ওয়ানডে স্টাইলে খেলে মাত্র ১২২ বলে ধনানজয়া তুলে নিয়েছেন টেস্ট ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় সেঞ্চুরি। সঙ্গী মেন্ডিস অপরাজিত ৮৩ রানে। দুটি ক্যাচ মিসের মাশুল দিন শেষে দিল বাংলাদেশ। আর ওই সুযোগে গলার ফাঁসটাও আলগা করে নিলেন মেন্ডিসরা। স্পিন স্পিন রব তোলা উইকেটে দিনের শুরুতে কিছু টার্ন দেখা গেলেও এখনো এটিকে ব্যাটিং সহায়কই বলা যায়। তাই কালকের প্রথম সেশনে দ্রুতই কিছু উইকেট তুলে নিতে না পারলে আর যাই হোক, জয়ের আশা বাদ দিয়ে দিতে হবে বাংলাদেশকে। তৃতীয় সেশনে ওই অর্থে কোনো বোলারই কঠিন পরীক্ষা নিতে পারেননি লংকান দুই ব্যাটসম্যানের। হতাশার ছাপটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল শরীরের ভাষাতেও। উইকেটের জন্য মরিয়া বাংলাদেশ ৩৬ থেকে ৪২। ছয় ওভারের মধ্যেই শেষ করে ফেলেছে রিভিও। প্রতিবারই বোলার ছিলেন তাইজুল। দিন শেষে মোসাদ্দেককে দিয়েও চেষ্টা করেছেন মাহমুদুল্লাহ। তৃতীয় সেশন পুরোটাই নিজেদের করে নিলেও শ্রীলংকা এখনো পিছিয়ে ৩২৬ রানে।

সেশন হিরো : ধনানজয়া ডি সিলভা