যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ও ইসলামি চিন্তাবিদ তারিক রামাদানকে ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ফরাসি দুইজন নারীর অভিযোগের প্রেক্ষিতে প্যারিসের পুলিশ বুধবার তাকে আটক করে। যুক্তরাজ্যের দ্য গার্ডিয়ান ও রাশিয়ার আরটি তাদের অনলাইন ভার্শনে খবরটি জানিয়েছে।
ফ্রান্সের পুলিশ জানায়, দুইজন নারীর অভিযোগের ভিত্তিতে তারিক রামাদানকে তদন্তের স্বার্থে আটক করা হয়েছে।
গত বছরের নভেম্বরে ফ্রান্সের নারীবাদী লেখিকা হেন্দা আয়ারি ও অন্য একজন নারী তারিক রামাদানের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ তোলেন।
জ্যেষ্ঠ এই লেখিকা তার টুইটার পোস্টে বলেছেন, “আমাকে হোটেলে এমনভাবে জাপ্টে ধরেছিলেন যেন আমি মরে যাচ্ছিলাম। ২০১২ সালে তার একটি লেকচার অনুষ্ঠানের পর সে আমার ওপর এমন করে ঝাপিয়ে পড়েছিল।”
যুক্তরাষ্ট্রের হলিউডে “হ্যাশট্যাগ মি টু” আন্দোলন ছড়িয়ে পড়লে ফ্রান্সে শুরু হয় “এক্সপোজ ইউর পিগ” তথা “তোমার ধর্ষককে চিনিয়ে দাও” শীর্ষক আন্দোলন। এই আন্দোলনের ফল হিসেবেই এই অধ্যাপকের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসতে থাকে। এমন পরিস্থিতিতে তিনি অক্সফোর্ডের অধ্যাপকের পদ থেকে সরে দাড়ান। তবে তার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগের কোনটিই এখন পর্যন্ত প্রমাণিত নয়।
তবে ওই লেখিকার বিরুদ্ধে মানহানির মামলাও দিয়েছেন সেইন্ট অ্যান্থনি কলেজের এই রিসার্চ ফেলো। তিনি এসব অস্বীকার করে এগুলোকে তার বিরুদ্ধে করা ষড়যন্ত্র হিসেবে দাবি করেছেন। তিনি বলেছেন, “আমার সাথে শত্রুতা করে পরিকল্পিত ভাবে এসব করা হচ্ছে।”
মিশরের সাবেক ইসলামপন্থী নেতা মুসলিম ব্রাদারহুডের (ইখওয়ানুল মুসলিমীন) প্রতিষ্ঠাতা হাসান আল বান্নার নাতি তারিক রামাদান সুইজারল্যান্ডে কৈশোর পার করলেও বর্তমানে তিনি ফ্রান্সের নাগরিক। মুসলিম বিশ্বে ইসলামের রাজনৈতিক ভাষ্যের একজন গুরুত্বপূর্ণ চিন্তাবিদ হিসেবে তাকে মান্য করা হয়। এছাড়াও পশ্চিমা জ্ঞান চর্চার পরিমন্ডলেও তার খ্যাতি কম নয়।
নব্বইয়ের দশকে তারিক রামাদান ফরাসি মুসলিমদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেন। তিনি বলতেন, ইসলাম ইতোমধ্যে ফ্রান্সের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গিয়েছে, মুসলিমরাও এখন সমান অধিকার ভোগ করবে, তাদেরকে নিজেদের ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করতে দিতে হবে। ফরাসি পরিচয়ে একজন মুসলমান নির্ভয়ে চলতে ফিরতে পারবে। “ভিক্টিম মেন্টালিটি” থেকে মুক্ত হতে হবে। এসব কথা সেসময় বিদ্যুতের গতিতে ছড়িয়ে পড়ে, ফরাসি মুসলিমরা এসব কথাকে বিপ্লবী বক্তব্য হিসেবেই নেয়।
তিনি বলতেন, ইসলামকে ফরাসিদেশের বিশ্বাস আকারে দেখতে হবে। আইনকানুন মেনে প্রত্যেক মুসলিম তাদের ধর্ম সঠিকভাবে যাতে পালন করতে তার পক্ষে তিনি সোচ্চার ছিলেন। তবে ফ্রান্স সরকার সেসব মানেনি। তার প্রমাণও মেলে ২০০৪ সালে এসে মুসলিম নারীদের হিজাব বা ওড়না দিয়ে মুখ ঢেকে চলা ফেরার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় দেশটির সরকার।
ফ্রান্সের সেকুলার জ্ঞানপদ্ধতির মধ্যে তিনি ইসলামরে আলোচনাটাকে এমন ভাবে তুলেছেন, ফরাসিরা তার অবস্থানকে গুরুত্ব দিতে বাধ্য হন। তিনি ফরাসি সমাজে কতোটা ফ্যাক্টর সেটা অনুমান করা যায় একটি তথ্য জানলে। ইসলামবিদ্বেষী ফরাসি লেখক মাইকেল হুয়ালাবেক এর উপন্যাস ‘সাবমিশন’ এর চরিত্র মোহামেদ বেন আব্বেসকে ফ্রান্সের প্রথম মুসলিম প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেখানো হয়। সেখানে মোহামেদ বেন আব্বেস এর যে বর্ণনা দেয়া হয়, স্পোর্টস জ্যাকেটওয়ালা, দাড়িছাটা এক সুপুরুষ হিসেবে। যার পুরোটাই মিলে যায় অধ্যাপক তারিক রামাদানের চালচলন গঠন গাঠনের সাথে।
অন্যদিকে ফ্রান্সে সম্মান মর্যাদাও কম পাননি তারিক রামাদান। বিখ্যাত ‘লা মন্ড’ পত্রিকার সাবেক প্রধান সম্পাদক এবং ‘মিডিয়াপার্ট’ এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রকাশক এডভি প্লেনেল, ‘লা মন্ড ডিপ্লোম্যাটিক’ এর সাবেক সম্পাদক অ্যালেন গ্রেশ, সমাজবিজ্ঞানী এডগার মরিনসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে নানা সময়ে পাশে পেয়েছেন। এছাড়াও ফ্রান্সে থাকাকালে তিনি যখন বক্তব্য রাখতেন, রাজনীতিবিদ হতে সাংবাদিক, দোকানদার হতে ইমাম ও মুসলিম এবং বিশ্বায়ন বিরোধী আন্দোলনের লোকজন সবাই মনযোগ দিয়ে শুনতেন।
সেদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক কর্মকর্তা ও ইসলাম বিষয়ে ডিগ্রিধারী বার্নার্ড গোডার্ড বলেছেন, গত ২ হাজার সালের দিকেও তার শ্রোতা অনুসারী এতো ছিলো যে মনে হতো যেন “তিনি সবখানেই আছেন আবার কোনোখানেই নেই।”