তিনটির দুটিতেই সেশন হিরো মুমিনুল

তিনটির দুটিতেই সেশন হিরো মুমিনুল

বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা রকেট টেস্ট সিরিজ
প্রথম টেস্ট, ১ম দিন
জহুর আহমেদ চৌধুরী ক্রিকেট স্টেডিয়াম, চট্টগ্রাম

• দশম খেলোয়াড় হিসাবে বাংলাদেশকে টেস্ট নেতৃত্ব দেয়ার গৌরব অর্জন করলেন মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ
• ‎৮৭ম বাংলাদেশি হিসাবে টেস্টে অভিষেক হলো সানজামুল ইসলামের
• ‎বাংলাদেশের হয়ে দ্রুততম ২০০০ রান করলেন মুমিনুল, লেগেছে ৪৭ ইনিংস
• ‎৯৬ বলে করা মুমিনুলের শতকটি টেস্টে বাংলাদেশের দ্বিতীয় দ্রুততম
• ‎ষষ্ঠ বাংলাদেশি হিসাবে ২০০০ রানের ক্লাবে প্রবেশ করলেন মুমিনুল
• ‎দিন শেষে বাংলাদেশের সংগ্রহ : ৩৭৪/৪ (মুনিনুল ১৭৫*, মাহমুদুল্লাহ ৯*)
• মুমিনুল-মুশফিকের ২৩৬ তৃতীয় উইকেট জুটিতে বাংলাদেশের ষর্বোচ্চ
• ‎৩৭৪, একদিনে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সংগ্রহ

প্রথম সেশন

দশম বাংলাদেশি অধিনায়ক হিসাবে টস করতে নামেন মাহমুদুল্লাহ। প্রথম ম্যাচেই টস জিতলেন তিনি। হাসিমুখে নেয়া ব্যাটিং এর সিদ্ধান্তের প্রতি সুবিচার করেছেন বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা। শুরু থেকেই লঙ্কান বোলারদের ওপর চওড়া হয়ে খেলতে শুরু করেন তামিম-ইমরুল। সবচেয়ে বেশি চওড়া হন লঙ্কান পেসার লাহিরু কুমারার ওপর। তরুণ এ পেসার পুরোটা সময়ই যুদ্ধ করেছেন সঠিক লাইন-লেংন্থ খুঁজে পেতে। তাতেও বিশেষ লাভ হয়নি। প্রথম সেশনে করা সাত ওভারে দিয়েছেন ৪৫ রান। ওয়ানডে স্টাইলে খেলতে থাকা তামিম নিজের অর্ধশতক তুলে নেন মাত্র মাত্র ৪৬ বলে। দিলরুয়ান পেরেরার অসাধারণ এক কুইকারে বোল্ড হবার আগে দেশ সেরা এই ওপেনার করেন ৫২ রান। ছয়টি চারের পাশাপাশি দিলরুয়ান পেরেরার বলে মেরেছেন দারুন এক ছয়। এটি টেস্টে তার ২৫ তম অর্ধশতক। তামিমের বিদায়ে ভাঙে ৭৫ রানের উদ্বোধনী জুটি। এরপর ক্রিজে আসেন বাংলাদেশের টেস্ট স্পেশালিষ্ট মুমিনুল হক। উইকেটে এসে স্বাচ্ছন্দ্যের সাথে খেলতে থাকেন তিনিও। অপর প্রান্তে নিজের প্রিয় পজিশন ওপেনিং এ ফেরা ইমরুলও ছিলেন স্বপ্রতিভ। তামিমের বিদায়ের পর মুমিনুলকে নিয়ে রানের চাকা সচল রাখেন তিনি। মুমিনুলের সাথে গড়েন ৪৮ রানের জুটি। তাদের চমৎকার ব্যাটিংয়ের সামনে অসহায় দেখাচ্ছিলো সব লঙ্কান বোলারদেরই। লাঞ্চ ব্রেকের মাত্র দু বল আগে সান্দাকানের বলে লেগ বিফোরের ফাঁদে পড়ে ক্রিজ ছাড়েন ইমরুল। যদিও রিপ্লেতে দেখা গিয়েছে বলটি স্ট্যাম্প মিস করতো। কিন্তু হাতে রিভিও থাকার পরেও সেটি ব্যবহারের কোনো আগ্রহ দেখাননি ইমরুল-মুমিনুলের কেউই। শেষ মুহুর্তে তার এই উইকেটটি না পড়লে পুরো সেশনটিই বাংলাদেশের বলা যেতো। ক্রিজ ছাড়ার আগে ইমরুল করেন ৪০ রান। খেলেছেন ৭৫ বল, চারের মার ছিলো চারটি।

প্রথম সেশন শেষে স্কোর: বাংলাদেশ ১২০/২

সেশন হিরো: তামিম ইকবাল

দ্বিতীয় সেশন

প্রথম সেশনে যদি তামিম-ইমরুল ট্রেলার দেখিয়ে থাকেন তবে জমজমাট চিত্রনাট্যের পুরো স্বাদটা দিয়েছেন মুশফিক-মুমিনুল। চাইলে এটিকে মুমিনুলের সেশনও বলা যায়। কিন্তু এখানে বাধা হয়ে দাড়াচ্ছেন পার্শ্বনায়ক মুশফিক। অধিনায়কত্ব হারাবার পর প্রথম টেস্ট খেলতে নামা মুশফিক পুনরায় চিনিয়েছেন নিজের জাত। অসাধারণ ফুটওয়ার্ক, মুমিনুলের সাথে চমৎকার বোঝাপড়া, বলের মেরিট বুঝে শট বাছাই; আপনি যেকোনো প্রশংসামূলক শব্দ ব্যবহার করতে পারেন মুশফিকের এই সেশনের ব্যাটিংয়ে। পার্শ্বনায়ক যখন এমন খেলেন তখন মূল নায়ক কতটা অসাধারণ ছিলেন তা অনুমান করতে বিশেষজ্ঞ হতে হয় না। লঙ্কান বোলারদের নাকের পানি চোখের পানি এক করে খেলেছেন চোখ ধাঁধানে সব শট। কাট, লেট কাট, ড্রাইভ কি ছিলো না মুমিনুলের ব্যাটিংয়ে? হাথুরুর হেয়ালিপনায় হারিয়ে যেতে বসা মুমিনুল উপেক্ষার জবাব দিতে কতটা উদগ্রিব ছিলেন তা বোঝা গিয়েছে সেঞ্চুরি ছোয়ার পর তার বুনো উল্লাসেই। নব্বইয়ের ঘরে থেকে ডাউন দ্য ট্র্যাকে গিয়ে দুটি চার মেরে সেঞ্চুরিতে পৌছাতে আলাদা জাত লাগে, যা মুমিনুলের বেশ ভালোই রয়েছে। আর এটিই চিনতে অক্ষম ছিলেন হাথুরু। নিজের পঞ্চম টেস্ট শতকটি তুলে নিয়েছেন নিখুঁত ব্যাটিং করে। অবাক করার মতো বিষয় যেটি, তা হলো ওয়ানডে দলে ব্রাত্য মুমিনুল শতক ছুঁয়েছেন মাত্র ৯৬ বলে ১৩টি চারের সাহায্যে। পুরো সেশনে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের সামনে মাথা কুটে মরেছেন লঙ্কান বোলাররা। সমান মার খেয়েছেন সকলেই। দ্বিতীয় সেশনের ২৮ ওভারে ১৩০ রানই বলে দিচ্ছে কতটা আক্রমনাত্বক ছিলেন মুশফিক-মুমিনুল। ২৮ দশমিক ২ ওভারের অবিচ্ছিন্ন ১৩০ রানের জুুটিতে এ দুজন ওভারে সাড়ে চারের বেশি করে রান তুলেছেন। চা পানের বিরতিতে যাবার সময় মুমিনুল অপরাজিত ছিলেন ১০৭ রানে এবং মুশফিক ৪৭ রানে।

দ্বিতীয় সেশন শেষে স্কোর: বাংলাদেশ ২৫০/২

সেশন হিরো: মুমিনুল হক।

তৃতীয় সেশন

যে কোনো চিত্রনাট্যই ভিলেন ছাড়া কেমন যেন পানসে লাগে। নায়করুপে আবির্ভুত মুমিনুল আর পার্শ্বনায়কের চরিত্রে মুশফিকের দুর্দান্ত নৈপুণ্য রোখার জন্য তেমন একজন ভিলেনকেই খুজছিলেন লঙ্কান দলপতি চান্দিমাল। প্রথম সেশনে বেধড়ক মারের ধারা দ্বিতীয় সেশনেও অব্যাহত থাকলে কিছুটা মুষড়ে পরতে দেখা যায় লঙ্কানদের। যাকে ভাবা হচ্ছিলো বাংলাদেশের সম্ভাব্য মূল হন্তারক সেই হেরাথের বলকে দু কদম এগিয়ে যখন মাঠ ছাড়া করলেন মুমিনুল তখন লকমলের শরনাপন্ন হন চান্দিমাল। পুরো ইনিংসেই নিখুঁত ব্যাটিং করা মুশফিক উইকেটের অনেক বাইরের একটি বলে ব্যাট ছুঁইয়ে পথ ধরেন ড্রেসিংরুমের। শতকের সম্ভাবনা জাগানো চমৎকার ইনিংসটির সমাপ্তি ঘটে ৯২ রানে। দীর্ঘক্ষণ পরে হাসিফুটে লঙ্কানদের ঠোটে। মুমিনুল-মুশফিকের ম্যারাথন ২৩৬ রানের জুটি ভাঙার আনন্দের আনন্দিত লঙ্কানদের হাসি চওড়া করার দায়িত্ব যেন নিজের কাধে তুলে নিলেন লিটন দাস। লকমলের লাইনের উপর করা বলটি ঠিক কোন চিন্তায় ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত তিনি নিয়েছিলেন, তা লিটনই ভালো বলতে পারবেন। মুশফিকের বিদায় বা লিটনের খেয়াল; কোনো কিছুই ছাপিয়ে যেতে পারবে না মুমিনুলকে। দিনশেষে লকমল হয়তো লঙ্কানদের স্বস্তির দুটি উপলক্ষ্য এনে দিয়েছেন কিন্তু দিনটি শুধুই মুমিনুলের। প্রথম দুই সেশন রাজ করা এ বাহাতি দিন শেষ করেছেন ১৭৫ রানে অপরাজিত থেকে। হাথুরুর খেয়ালে নিজেকে হারায়ে খোজা মুমিনুল হাথুরুর লঙ্কাকেই বেছে নিলেন তার প্রতি হওয়া অবিচারের জবাব দিতে। আর তার সে জবাবে নিজ অধিনায়কত্বের প্রথমদিনটি যেন জান্নাতের সুখ পেয়েই শেষ করলেন মাহমুদুল্লাহ। কাল সকালে পুনোরায় যখন মাঠে নামবে বাংলাদেশ, মুমিনুলের লক্ষ্য থাকবে নিজের প্রথম ডাবলটা বগলদাবা করার এবং মাহুমুদুল্লার লক্ষ্য থাকবে অধিনায়ক হিসেবে নিজের প্রথম ইনিংসটিকে স্বরণীয় করে রাখার। দুজনের একজনও যদি সফল হন, ম্যাচে লাগাম; যা ইতোমধ্যেই অনেকটাই বাংলাদেশের হাতে, তা যে পুরোটাই হাতে চলে আসবে তা অনায়াসেই বলা যায়। উল্লেখ্য যে, মুশফিক-মুমিনুলের ২৩৬ শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম জুটি। সর্বোচ্চ (২৬৭ রান) জুটিতেও ছিলেন মুশফিক, সেবার সঙ্গী ছিলেন মোহাম্মদ আশরাফুল।

প্রথম দিন শেষে স্কোর: বাংলাদেশ ৩৭৪/৪

সেশন হিরো: মুমিনুল হক